সাহিত্য পত্রিকা-ই বলা যেতে পারে...

সায়ন ঘোষ

একটি গদ্য

  

সতেরো শতকের মধ্যভাগে জাপানে, কবি মাতসুও বাশো ও উয়েশিমা অনিতসুরা 'হোক্কু' নামক একটি জাপানি কোবিতার ফর্ম প্রচলিত করেন, যা মূলতঃ ৫-৭-৫ ফর্ম-এ লেখা হোতো। পরে, ঊনিশ শতকের শেষের দিকে জাপানি কবি মাসাওকা শিকি এই বিশেষ কবিতা ফর্মটির নামকরণ করেন 'হাইকু'। সম্ভবত তারপরেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে হাইকুর প্রচলন হয়। প্রথম দিকে, জাপানে, মূল ৫-৭-৫ ফর্মে হাইকু লেখা হোলেও পরবর্তীকালে হাইকুর মূল আত্মাকে সংরক্ষিত রেখে নিজেদের মতো কোরে হাইকু বিনির্মান কোরেছেন বিভিন্ন কবি। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং জাপানে গিয়ে হাইকুর প্রতি প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং এর ফলস্বরূপ বেশ কিছু হাইকু রচনা কোরে ফেলেছিলেন।


হাইকুর সাথে 'জেন' এর অবিচ্ছেদ্য প্রাসঙ্গিকতা লক্ষ্য কোরি। মূলত হাইকু যারা লেখেন তারা খুব কম শব্দে বা বাক্যে একটা সহজ দৃশ্য বা ঘটনা উপস্থাপিত করেন। কিয়ারোস্তামির বেশ কিছু হাইকু আমাকে প্রভাবিত কোরেছিলো এক সময়। আর মাতসুও বাশো। এক অনন্য অভিজ্ঞতা। একটা ছোটো টোকা। চূড়ান্ত ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতায় লুকিয়ে থাকে হাইকু, তাই হাইকু সবাইকে নাও ছুঁতে পারে। আর এখানেই জেন প্রাসঙ্গিকতা বিস্তার করে এবং জেন ছাড়া হাইকু কখনই উপলব্ধি করা যাবে না বলে আমার মনে হয়। ডি.টি. সুজুকি-র An Introduction to Zen Buddhism বইটা পড়ে আমার এই মনোভাব আরো দৃঢ় হয়।  'জেন' শব্দটির উৎপত্তি মুলত সংস্কৃত শব্দ 'ধ্যান' থেকে। জেন আর কিছুই নয়, এক নতুন দৃষ্টিকোণ -- এক ভিন্ন আঙ্গিক থেকে সবকিছু লক্ষ্য করা, অথবা য্যানো জেগে ওঠা, ঘুম থেকে। আমাদের প্রত্যহ জীবনপ্রণালীর প্রতিটি স্তরে জেন সূক্ষ্ম ভাবে নিহিত আছে -- আবিস্কারের প্রত্যাশায়। 


জাপানের কোনো এক আশ্রমে একবার এক বিশিষ্ট আচার্য তার শিষ্যকে জিজ্ঞেস কোরেছিলেন, "সত্যে নিষ্ঠ হওয়ার জন্য তুমি কি কিছু অনুশীলন করো?"

"হ্যাঁ, কোরি।"

"কি এমন করো তুমি নিজের সাথে?"

"যখন ক্ষুধার্ত থাকি খাই, ক্লান্ত হোলে ঘুমোই।"

"এ তো সকলেই করে। তাহোলে তারাও কি তোমার মতো বোলতে পারে যে তারা সত্যে নিষ্ঠ হওয়ার অনুশীলন কোরছে?"

"না।"

"ক্যানো নয়?"

"কারণ তারা যখন খেতে বসে, আসলে তারা খায় না, বরং অসংখ্য চিন্তার ঊর্ণজালে বন্দী হয় এবং নিজেদের বিরক্ত থাকতে বাধ্য করে; তারা যখন ঘুমোয় আসলে তারা ঠিক ঘুমোয় না, বরং হাজার রকম স্বপ্ন দ্যাখে আর এইজন্যেই তারা আমার থেকে আলাদা।"


কোনো একটি বিশেষ বস্তুকে কিভাবে দেখছি তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে জেনের প্রকৃত আধার। বাতাসে উড়ে ব্যাড়ানো পাখিদের মতো অথবা গভীর জলে ক্রীড়ারত মাছেদের মতো জীবনে বেঁচে থাকতে হয়, মুক্ত ভাবে; এ কথা জেন বলে। আর যোশু য্যামনটা বলেন, "জেন হোলো তোমার প্রাত্যহিক চিন্তা"। তাই হাইকু পাঠ কালে আমরা কোবির অবচেতন মনে বাস করা টুকরো টুকরো চিন্তা বা ঘটনার ফ্র‍্যাগমেন্ট পেয়ে থাকি। হোতে পারে সেটা খুব সাধারণ ঘটনা। নিহিলিজম্ ইজ নট্ জেন। যুক্তি দিয়ে একে ধর্তব্যে আনা যায় না। ইন্টেলেক্ট দিয়ে একে বোঝার চেষ্টা কোরলে কোনো তল পাওয়া যায় না। দেয়ারফোর হাইকু ইজ নট্ নিহিলিজম্। এটা হোলো বাতাসে ভেসে ব্যাড়ানো সুর; তোমার নিজস্ব তন্ত্রীতে বেজে ওঠার আকাঙ্খায়।

image2