সাহিত্য পত্রিকা-ই বলা যেতে পারে...

মাৎসুও বাশো

বাংলায় ভাষান্তর : দেবরূপ সরকার

  

মাৎসুও বাশোর কয়েকটি হোক্কু



(কবিতাগুলি ডেভিড ল্যাণ্ডিস বার্নহীল কৃত ইংরাজিত অনুবাদ থেকে বাংলায় অনুদিত হলো)


[মাৎসুও বাশো(১৬৪৪-১৬৯৪) বা মাস্টার অফ হাইকু সম্পর্কে নতুন করে কিছুই বলার নেই। তবে বাশো কবিতাগুলোকে হাইকু না বলে হোক্কু ক্যানো বলছি সেবিষয়ে অন্তত একলাইন ব্যয় না করলেই নয়। জাপানে হাইকু, হাইকাই এবং হোক্কু—এই তিনধরনের কবিতার প্রচলন আছে, যারা আকৃতি ও গঠনগত ভাবে পরস্পর পরস্পরের খুবই কাছাকাছি। তবে এদের পৃথকীকরণ মূলতঃ সময়কাল ও আধুনিকীকরণের ওপর ভিত্তি করে। হোক্কু হলো হাইকাই ও হাইকুর মাধ্যবর্তী একটি কবিতারীতি এবং বাশোর হাইকু অর্থে আমরা যা জানি, সেটা আসলে হোক্কু। জাপানে হাইকুর প্রচলন মূলতঃ আরেক বিখ্যাত কবি মাসাওকা শীকি(১৮৬৭-১৯০২)-র হাত ধরে। সহজ অর্থে, ওয়াকা কবিতা রীতি থেকে ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে হাইকাই কবিতারীতি প্রচলিত হয়। পরবর্তীতে প্রায় ঊনবিংশ শতকে প্রচলিত হয় হাইকু। এবং এই উভয়রীতির মাঝের সেতুটি হলো বাশো প্রচলিত হোক্কু। 

আরো একটি কথা না বললেই নয়—বাশো জন্মাচ্ছেন ১৬৪৪ সালে এবং এই ২০১৯-এ আমি এক সদ্য যুবক। ফলতঃ বাশো ও আমার মধ্যে যেকোনো প্যারামিটারেই যেমন ফারাক বিস্তর, সেরকমই, বাশোর কবিতা ও আমার অনুবাদের মধ্যে ততটাই যে ফারাক থেকে যাবে, সে বলা বাহুল্য। ফলতঃ বাশোর কবিতার স্বাদ এই অনুবাদগুলো থেকে আশা করা নিরর্থক।

বাশোর কবিতায় প্রাকৃতিক বর্ণনা, ঋতুবৈচিত্র ও নৈসর্গিক মেহনে জারিত। ১৬৮৪ থেকে ১৬৯৪ সালের মাঝামাঝি বসন্তে লেখা বাশোর কয়েকটা কবিতার অনুবাদ এখানে দেওয়া হলো।]


শরৎ ১৬৮৪

(১)

জোকীয় শহরে এটা আমার প্রথম শরৎ, অষ্টম মাস। যেহেতু আমি নদীর ধারের জীর্ণ কুঁড়েঘরটা ছেড়ে বাইরে এসেছি, আমার মনে হচ্ছে, বাতাসের শব্দগুলো অভাবনীয় শীতল।

প্রতিটা অস্থি ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছে

আমার মনে হচ্ছে, এই হাওয়া আমার শরীর ভেদ করে

ক্রমশই ছুটে যাচ্ছে হৃদয়ের কাছে


(২)

শরৎ, দশ বছর:

এখন আমি আমার পুরোনো বাসস্থান এডোর অভিমুখে

শিকড়ের অভিমুখে


(৩)

যে দিন আমি বাঁধটা অতিক্রম করলাম, সেই দিন প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিলো এবং পর্বতের চূড়াগুলো লুকিয়ে পড়েছিলো মেঘের আড়ালে।

একটা ঘোলাটে বর্ষা,

অস্পষ্ট ফুজি পর্বতে গোটা একটা দিন:

রহস্যময় ও মনোরম


(৪)

এই মেঘ ও কুয়াশার মাঝে

প্রতিটা ক্ষুদ্র মুহূর্তের শতাধিক দৃশ্যাবলী

আমায় পৌঁছে দ্যায় পরিপূর্ণতার কাছে


(৫)

যারা বাঁদরের ভাষা বোঝে:

শরতের এই ভয়ানক হাওয়ার মঝে

পরিত্যক্ত বাচ্চাটার এখন কী হবে?


(৬)

ঘোড়ার পিঠে বসে যাত্রাকালীন লেখা কবিতা

এই সমতলের রাস্তার ধারে জন্মানো

গোলাপগুলো: ক্রমশই তলিয়ে যাচ্ছে

আমার ঘোড়ার উদরস্থ ক্ষুধায়


(৭)

আমি সায়ো-নো-নাকায়ামা তে পোঁছোলাম আর সচকিত জেগে উঠলাম য্যানো আমি একটা দীর্ঘ স্বপ্ন থেকে হেঁটে চলে যাচ্ছি দু মু-এর “প্রভাতী বিদায়”-এর ভেতর। 

একটা দীর্ঘ ঘুমের রেশ নিয়ে,

ঘোড়ার পিঠে বসে ঝিমোচ্ছি:

আগুনের ধোঁয়া ভেসে আসছে অদূরের কোনো গৃহস্থ থেকে


(৮)

আমি মুৎসুবায়া ফুবাকু-তে গিয়েছিলাম, প্রায় দশ দিন একটু জিরিয়ে নেওয়ার জন্য। রাতের দিকে আমি বাইরের মন্দিরে প্রার্থনার জন্য যেতাম। এখানে সেখানে জ্বলে থাকা কয়েকটা লন্ঠন এবং তাদের বিপরীতে রহস্যময় ছায়া। উঁচু চুড়া থেকে পাইনের গাছ ছুঁয়ে ধেয়ে আসা বাতাস আমার মাংস ভেদ করে য্যানো গেঁথে যাচ্ছিলো আমার হৃদয়ের গভীরে। 

মাসটা ফুরিয়ে এলো, আকাশে চাঁদ নেই:

একটা হাজার বছর পুরোনো গাছ

আশ্লিষ্ট হয়ে আছে একটা ঝড়ের দ্বারা


(৯)

এই উপত্যকার নীচের দিকটায় একটা ঝরণা আছে। সেখানে একজন স্থানীয় মহিলা আলু ধুচ্ছিলেন। তাঁর দিকে অনেকক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে:

আলু ধুতে ব্যস্ত এক মহিলা:

এর বিকল্পে এই মনোরম উপত্যকায়

তিনি হয়তো একটা ওয়াকা লিখতে পারতেন


(১০)

যখন আমি একটা চায়ের দোকানে থামলাম, একটি মহিলা, যাঁর নাম প্রজাপতি, আমায় অনুরোধ করলেন তাঁর নাম দিয়ে একটা কবিতা লিখতে। তিনি আমায় একটা সাদা কাপর এনে দিলেন, এবং আমি তার ওপর লিখলাম:

একটা পাহাড়ি ফুলের ঘ্রাণ—

প্রজাপতির ডানার মতোই

উদ্দীপক এর সুগন্ধ


(১১)

শান্তিপূর্ণ পরিবেশে একটা নির্জন খড়ের কুঁড়েঘরে থাকাকালীন লেখা

একটা আইভি গাছ লাগালাম,

এবং চার-পাঁচটা বাঁশের ডাল

এই ঝোড়ো আবহে


(১২)

নবম মাসের গোরার দিকে আমি বাড়ি ফিরলাম। আমার মায়ের ঘরের পাশে অবহেলিত ঘাসগুলো ঠাণ্ডায় মুছে গ্যাছে এবং ওগুলোর পূর্ব উপস্থিতির আর কোনো চিহ্নই নেই। ফেলে যাওয়া সবকিছুই য্যানো বদলে গ্যাছে। আমার ভাই ও বোনেদের চোখে চারধারে চামড়া কুঁচকে গ্যাছে। “আমরা এখনো বেঁচেই আছি”—এটাই আমরা বলতে পারি। আমার বড়ো দাদা আমায় একটা জীর্ণ বাক্স ধরিয়ে বললো, “মায়ের স্মৃতিতে কিছু দান করো। য্যামন উরাশিমা দিয়েছে তার গয়নার বাক্স। তুমিও তো ক্রমশই বুড়িয়ে যাচ্ছো।” তারপর, কিছুক্ষণ, আমরা সবাই কান্নায় ভেঙে পড়লাম।

এটা কী আমার হাতে নেওয়া উচিৎ

এই অশ্রুর উষ্ণতায় এটা গলে যাবে:

শরতের শৈত্য


(১৩)

ইয়ামাটো অঞ্চলের ভেতরেই আমরা ক্রমশই এগিয়ে যেতে থাকলাম। যে জায়গাটার উদ্দেশ্যে আমরা এগোচ্ছি, তার নাম টেক-নো-উচি এবং এটি কাতসুজ জেলার অন্তর্গত। এখানকার একটা শহরে আমার পরিচিত চিতি থাকে। ফলত: আমরা কিছুদিন এখানেই বিশ্রাম করবো।

তুলো ভাঙার ঘুনুরি—

বাঁশের এই যন্ত্র নির্গত যে সুর

তা বাঁশির মতোই প্রবোধক


(১৪)

ফুটাগামি পর্বতের তাইমা মন্দির ঘুরে দ্যাখার সময় পেছনের দিকে একটা পাইন গাছ দেখলাম, যেটা নিঃসন্দেহে হাজার বছর পুরোনো এবং এতোই বড়ো যে একটা গোটা ষাঁড়ও সহজে লুকিয়ে পরতে পারবে এর পেছনে। হয়তো এটা বুদ্ধর সময়কার এবং বুদ্ধের সাথে এই যোগাযোগই একে কাঠুরের কুড়ুলের হাত থেকে বাঁচিয়েছে। কী ভাগ্যবান, কী অদ্ভুত!

সন্ন্যাসীগণ, ভোরের গৌরব:

কত মানুষ মারা যায়, আর জন্ম ন্যায়;

ধর্মের পাইন গাছ তার সাক্ষ্য বহন করে


(১৫)

একটা গৃহ যাকে শীত ছুঁতে পারেনি—

টগবগ করে ভাত ফুটছে

শব্দটা শিলাবৃষ্টির কথা মনে করায়


(১৬)

একটা মন্দির লাগোয়া হোটেলে একটা রাত।

মন্দিরের একটি মহিলাকে বললাম—

এই আধ্যাত্মিক বাদ্য বাজাও,

এবং আমায় এই শব্দের কাছে আসতে দাও


(১৭)

শিয়াগোর কুঁড়ে ঘরটা অভ্যন্তরীণ মন্দিরের ডান পাশে, যেখানে পৌঁছোতে গেলে একটা কাঠের সাঁকোর ওপর দিয়ে কিছুটা যেতে হয়। এখান থেকে একটা খাড়া উপত্যকা দ্যাখা যায় তার সৌন্দর্য কল্পনাতীত। একটা পরিষ্কার প্রবাহমান ধারা, মনে হচ্ছে য্যানো প্রাচীন সময় থেকেই একইভাবে বয়ে চলেছে।

শিশিরকণা ফোঁটা ফোঁটা করে ঝরে পড়ছে:

আমার ইচ্ছে হচ্ছে এগুলো দিয়ে

ধুয়ে ফেলি এই ভাসমান পৃথিবীর যাবতীয় ময়লা


(১৮)

এই সার্বভৌম সমাধিক্ষেত্র এখানে এভাবেই রয়েছে

বহু বছর ধরে: তুমি কীসের স্মৃতিচারণ করছো,

পূর্ণাঙ্গ না স্পৃহার?


(১৯)

মিনোর অভিমুখে ওমি সড়ক দিয়ে ইয়ামাটো থেকে ইয়ামাশিরো হয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। এক কবি লিখেছিলেন, "শরতে হাওয়া য্যানো স্বয়ং প্রভু ইওশিটোমো”, এবং এই মিল দেখে আমার অবাক লাগে। এবার আমিও লিখলাম:

ইওশিটোমোর হৃদয়

উপস্থাপিত হচ্ছে:

শরতের বাতাসে


(২০)

ফুওয়া বাঁধে

শরতের বাতাস—

বয়ে চলেছে ফুওয়া বাঁধের

ঘন ঝোপ আর মাঠের ওপর দিয়ে


(২১)

যখন আমি মুশাসি সমতল থেকে যাত্রা শুরু করেছিলাম, আমার হাড়গুলো জমে গেছিলো এবং দুর্বল মন, কিন্তু এখন:

এখনো বেঁচেই আছি

এই যাত্রার শেষেও—

শরতের সন্ধ্যা

image9