সাহিত্য পত্রিকা-ই বলা যেতে পারে...

মালিনী ভট্টাচার্য

সারাশিনা গ্রামে যাত্রা (A Visit to Sarashina Village)


সারাশিনা গ্রামে যাত্রা (A Visit to Sarashina Village)

হেমন্তবাতাস মনে একরকম ইচ্ছে সঞ্চার করল - ওবাসুতে পাহাড়ের মাথায় পূর্ণচন্দ্র দেখব। বহুপূর্বে সারাশিনার সেই বন্ধুর পাহাড়ে গ্রামবাসীরা তাদের বৃদ্ধ মায়েদের পরিত্যাগ করে পাথরনুড়ির মধ্যে রেখে আসত। আরেকটি লোকেরও যাওয়ার ইচ্ছে দেখা গেলো, সে আমার ভক্ত, এৎসুজিন; সে সঙ্গে চলল। আর চলল একটি চাকর, আমার বন্ধু কাকেই-এর পাঠানো। পথে সে আমাদের দেখাশোনা করতে পারবে।  বলে রাখা ভালো কিসোর্ রাস্তা (অর্থাৎ যে রাস্তা ধরে আমরা সারাশিনা পৌঁছবো ) তা খাড়া ও বিপজ্জনক। বেশ কয়েকটি উঁচু পাহাড় ঘিরে সেই রাস্তা সাজানো। পরষ্পরকে আমরা সাহায্য করেছি, কিন্তু কেউই অভিজ্ঞ পর্যটক না হওয়ায় আমরা কিছু অস্বস্তিতে পড়েছি। ভুল করেছি ভুল সময়ে ভুল কাজ করে। অবশ্য এর ফলে ঘনঘন হাসিতে ফেটে পড়েছি আমরা, এগিয়ে চলার সাহস পেয়েছি।

পথে কোনোখানে আমাদের এক বৃদ্ধ পূজারীর সঙ্গে দেখা হয় - তাঁর ষাটের উপর বয়স হবে - পিঠে গুরুভার বোঝা নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে নড়বড় করে চলেছেন। মুখের ভাবটা খানিক গোমড়া খানিক গম্ভীর। আমার সঙ্গীরা সহানুভূতিতে তাঁর বোঁচকাটি নিয়ে আমাদের অন্য জিনিসপত্রের সঙ্গে সেটা আমার ঘোড়ায় চাপিয়ে দিল। অতএব আমাকে বসতে হলো একটা বড় স্তূপের ওপর। আমার মাথার উপর পাহাড়ের পর পাহাড় জেগে, আর বাঁদিকে এক বৃহৎ অতট হাজার ফুট নীচে নদীর অশান্ত জলে ঝাঁপ দিয়েছে। মধ্যে সামান্যতম সমতল জমি নেই - উঁচু জিনে বসে ঘোড়া ঝাঁকি দিয়ে উঠলেই আমি ত্রস্ত হয়ে পড়ছিলাম।

কাকেহাশি, নেজামে, সারু-গা-বাবা, টাচিতোগের মতো সংকটময় স্থান পেরিয়ে চললাম আমরা। চড়াইয়ের রাস্তা আমাদের বেড় দিয়ে চলল। আমরা যেন মেঘের মধ্যে হাতড়ে হাতড়ে আমাদের পথ খুঁজে নিচ্ছি। আমি ঘোড়া ছেড়ে দিয়ে টলমলে পায়ে খানিকদূর এগোলাম। সেই উচ্চতায় মাথায় ঝিম ধরেছিল, ত্রাসে মন এলোমেলো। যে চাকরটা সঙ্গে ছিল সে অনায়াসে ঘোড়ার পিঠে চাপল, তার দেখলাম ভয়ের পরোয়া নেই। সে প্রায়ই তন্দ্রালু হয়ে পড়ে, মনে হয় যেন অতর্কিতে খাদে পড়ে যাবে। তার মাথা ঝুঁকে এলেই আমি আতঙ্কে শিউরে উঠলাম। কিন্তু পরে ভেবে দেখলাম, আমরা সকলেই এই চাকরতার মতোই। ঝোড়ো আবহাওয়ায় পৃথিবীর বদলাতে থাকা প্রবালপ্রাচীরের মধ্যে আমরা বেরিয়ে পড়ি, জলে পা ডুবিয়ে হাঁটি, লুকোনো ঝুঁকির খবর রাখি না। বুদ্ধ উপর থেকে আমাদের দেখেন, তিনিও নিশ্চয়ই আমাদের গতির কথা ভেবে ঠিক সেই আশঙ্কাই বোধ করেন যা আমি সেই চাকরটার জন্য সেদিন করেছিলাম।

সায়াহ্নে রাত কাটানোর ব্যবস্থা করতে হল। আমরা থাকলাম এক সাধারণ বাড়িতে। বাতি জ্বালিয়ে কালি-কলম বার করলাম। চোখ বুজে সেদিনের দেখা দৃশ্য, সেদিনকার মনে মনে তৈরী করা কবিতা - এসব মনে করতে চাইছিলাম। সেই বৃদ্ধ পূজারী যখন দেখলেন আমি মাথায় মৃদু আঘাত করছি ও এক টুকরো কাগজের উপর ঝুঁকে পড়েছি, তাঁর বোধ হয় মনে হল আমি পথের ক্লান্তিতে ভুগছি। তিনি নিজের অল্পবয়সের তীর্থের গল্প করতে লাগলেন, পবিত্র সূত্র থেকে রূপক কাহিনী, আর যা যা অলৌকিক ঘটনা তিনি প্রতক্ষ্য করেছেন। হায়, এই বাধা এলো বলে আমার একটা কবিতাও লেখা হল না।  

যাহোক, ঠিক এই সময়েই ঝুলন্ত পাতার ফাঁক দিয়ে, দেয়ালের ফাটল দিয়ে চাঁদের আলো আমার ঘরে এলো। তখন গ্রামের লোক কাঠের খঞ্জনি বাজিয়ে বুনো হরিণ তাড়াচ্ছে, তাদের স্বর শুনতে পাচ্ছি। মনে ভাবলাম, হেমন্তের নিঃসঙ্গতা এইখানে সম্পূর্ণতা পেয়েছে। সঙ্গীদের বললাম, "চাঁদের এই উজ্জ্বল করের নীচে পান করা যাক।" গৃহস্বামী যে পানপাত্র আনলেন তাকে ঠিক পরিমার্জিত মাপের বলা যায় না, তার বিশ্রী সোনালী গালার চিত্রণ। মার্জিত শহুরেরা এই পাত্র হয়তো ছুতেঁন না, কিন্তু এমন সুদূর গ্রামাঞ্চলে কাপ ক'টা দেখে আমি বড় খুশি হলাম। মনে হলো, দামি পাথর বসানো, দূর্লভ নীল পানপাত্রের চেয়ে এই পেয়ালা দুর্মূল্য।

           পল্লী আকাশে বড় চাঁদ দেখে মনে হল

           তাকে সোনালী গালার কাজে সাজাই


     অতটের উপর ঝোলানো সেতুকে এক আইভির লতার 

                শরীরমন জড়িয়ে ধরেছে 


পুরাকালে সম্রাটদের ঘোড়াও এই ঝোলা সাঁকো পার করেছে নিশ্চয়ই 

              কিয়োটো যাওয়ার পথে

    সাঁকোর মাঝামাঝি এলে, কুয়াশা মেলালে 

    চোখের পলক ফেলা অসম্ভব হল (এৎসুজিন)


ওবাসুতে পাহাড়ে লেখা কবিতা :

    কল্পনায় দেখলাম এক বৃদ্ধা ও আমি পাশাপাশি রোরুদ্যমান

                     মুগ্ধ হয়েছি চাঁদের


  চাঁদ আজ ষোলো দিনের পুরনো

তবু আমি সারাশিনা গ্রামে পড়ে থাকি


তিনদিন কেটেছে, আর তিনবার আমি দেখেছি ঝলমল চাঁদ 

        ওই নির্মেঘ আকাশে (এৎসুজিন)


এক হলুদ ভ্যালেরিয়ানে সাজের মতো শিশিরকণা জমেছে 

    সে পাতলা বৃন্তের উপর দাঁড়িয়ে থাকে


ঝাঁঝাল মুলো আমার জিভ বিঁধিয়ে দিল 

   হেমন্তবাতাস মর্মে গিয়ে বিঁধল


কিসোর পাহাড়ের হর্স-চেস্টনাট হবে 

   নগরবাসীকে দেওয়ার উপহার


   বিদায় জানাতে, বিদায় নিতে 

কিসোর হেমন্তে প্রবেশ করলাম


জেনকোজি মন্দিরে লেখা কবিতা: 


চার দুয়ার ও চার ভিন্ন দল এক হয়ে নিদ্রিত 

    উজ্জ্বল চাঁদের নীচে 


   হঠাৎ ঝড় নাম আসামা পাহাড়ে 

  আমার সর্বাঙ্গে পাথর আঘাত করে






 


             অনুবাদটির সূত্র

অনুবাদটির সূত্র