সাহিত্য পত্রিকা-ই বলা যেতে পারে...

অয়ন ঘোষ

 হাইকু সম্বন্ধে লিখতে গেলে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে আরেকটা কাজ, দেখেছি। ২০১৫ নাগাদ প্রথম হাইকুর সংস্পর্শে যখন আসি, তখন জানতাম না কবিতা লেখার এই প্রাচীন ফর্মটিকে 'হাইকু' নামে ডাকা হয় এবং এর উদ্ভব জাপানে। আমি কখনোই হাইকু লেখার কথা ভাবিনি। জাপানি কবি মাতসুয়ো বাশোর কবিতা পড়ে প্রথমে প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। সন্দেহ নেই, পরে কালচক্রে পাঠ ও পুনঃপাঠে বিস্তর আনন্দ লাভ করেছি। লিওনার্ড কোহেন, স্টিভ রিচমন্ড, আব্বাস কিয়ারোস্তামির হাইকুধর্মী লেখাগুলো আমার অবচেতন মনকে পূর্বেই প্রভাবিত করেছিলো, যদিও যখন এই কবিতাগুলো পড়েছি হাইকু সম্পর্কে সেরকম সুস্পষ্ট কোনো ধারণা না থাকায় ফর্মের বিষয়ে সচেতন ছিলাম না। পরে জিম মরিসন, জিম উইটেনবার্গের লেখাতেও দেখেছি হাইকুর নির্যাস রয়েছে। আর এই হাইকুকে সারা পৃথিবীতে বিভিন্ন ভাষায় বিভিন্নভাবে লেখা হয়েছে। দেওয়া হয়েছে এর বিভিন্ন নাম। অ্যামেরিকান কবি স্টিভ রিচমন্ড য্যামন তার ফর্মটিকে ডাকতেন 'গাগাকু' বলে। বিট জেনারেশনের অ্যালেন গিন্সবার্গ, জ্যাক কেরুয়াকও হাইকু দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। এমনকি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত হাইকুর প্রেমে পড়েছিলেন জাপান সফরে গিয়ে। এই সংখ্যায় অনিন্দ্য রায় একটি লেখায় তা বিস্তারিত লিখেছেন। 
২০১৮ তে আমরা দু-তিন জন কিছু কবিতা কার্ড নামহীন ছাপিয়ে বন্ধুদের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছিলাম যা ছিলো মূলত একেকটা বুক মার্কের মতো দেখতে। নাম দেওয়া হয়েছিলো ওয়ার্ড বা সাউন্ড পোয়েট্রি। সেক্ষেত্রে আমরা নিজেদের মধ্যে একটা নীতি তৈরি করে নিয়েছিলাম যে এই কবিতাগুলো মূলত হতে হবে দশ লাইনের মধ্যে এবং প্রতি লাইনে একটি করে শব্দ। খুব কম কথায় আসল কথাটা বলতে হবে। এই ছিলো আমাদের প্রাথমিক ভাবনা। প্রথম কিছুদিন ইংরেজিতে ও পরে বাঙলায় এই লেখাগুলো আমরা ছাপাই। পরবর্তীতে মনে হয়েছে আমাদের এই কবিতাগুলো ভয়ংকরভাবে হাইকু দ্বারা প্রভাবিত। ধ্রুপদী হাইকুর যে ৫-৭-৫ বা তিন লাইনের যে রীতি তা আমরা কখনোই মানিনি। কারণ আমরা সচেতন ভাবে হাইকু লিখতে চাইনি কখনো। হাইকুর এই যে নির্যাস, এটাই আমাদের যথেষ্ট মনে হয়েছিলো। পরবর্তী কালে আরো কিছু এই ধরনের কবিতা লিখি যাকে সরাসরি হাইকু না বলে মুক্তক হাইকু বা হাইকুধর্মী কবিতা বলা যেতে পারে। কোয়ানের এই সংখ্যায় পাঠকের জন্য তার কয়েকটা  দিলাম। পাঠক, আপনি চাইলে একে কিছু না বলে শুধুমাত্র কবিতা পাঠেও মগ্ন হতে পারেন।


নিঁখুত সময়


নতুন সন্ধ্যে


আলোগুলোর জ্বলে ওঠা


শেষ কাকটির কা-কা


ঘণ্টাধ্বনি 


ঘর




রুটির সাদা টুকরো  

পর্যাপ্ত 

সমৃদ্ধ খাবার 


ওষুধপত্র



আর

কবিতাতো কবিতাকে ঠ্যাঙাচ্ছে

উদোম


তোরঙ্গ থেকে উৎপাদিত করছে ঘুমহীনতা 

ও কালো রাতগুলো আঁকড়ে ধরছে বিষাদগ্রস্ত পর্দাগুলোকে


উনুন

কয়লা



শীত সম্বন্ধে বলতে গিয়ে 

মাটি সংক্রান্ত তথ্যগুলো সামনে এগিয়ে আসছে

দোতলার বারান্দায় ধুলো

ধোয়া জামাকাপড় 


পড়ে গ্যালে খুব লাগে

জেনেছি সকলেই

অনুভব ও তীব্রতার সাথে

ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি 

শুনেছি

আস্তাবলের ধারে কাছে 

শেষ ঘাসগুলো 



মনের দ্বারা 

আচ্ছন্ন হলাম 


গীর্জার ঘন্টা 


সময় নেই 

সেখানে 

যাবার


অবরুদ্ধ 

পথ



বিচ্ছিন্নতার ঢেউ 

খেলানো হাসি 

মিলিয়ে যাচ্ছে 

তটের কাছে


রোদ



নৈঃশব্দ্য

ব্যাখ্যা করছে

খন্ড ত-কে


আমি আগুন 

কাঁচা হাতের কাছে


রাতের একটি অংশ




পবিত্র

গাছেরা


সূর্যদয় 

সম্মুখে


বিছানা


কাচের জ্যাকেট

তার পরনে


একটা বাগানে ঘুরছে সে



১০


বন্ধ ঘরগুলোতে


অন্ধকারের 

নক্ষত্র 


একটা 

পাহারাদার


১১


রাতের খাবার খেয়ে স্নান টান করে মনে পড়ছে সকালের সূর্যরশ্মির কথা


ওহ্

কি বলতে কি বলছি


বিকল্পধারার ইতিহাস


১২


কাদা মাখা জল

উঠোনের কাছে 

প্রথম বৃষ্টি


১৩


শবানুগমন 

মৃত প্রধানমন্ত্রীর মরদেহ

রাস্তায়


ভোরের স্বপ্ন
 

শিল্পীঃ লেখক

শিল্পীঃ লেখক