সাহিত্য পত্রিকা-ই বলা যেতে পারে...

অর্ক চট্টপাধ্যায়

নিরাময়ের আত্মহত্যা


শংসা প্রশংসা হতে না পেরে নিন্দা হয়ে উঠলে নিরাময় নিজের অক্ষমতার সঙ্গে ঘর করতে শুরু করে। কি মাহেন্দ্রক্ষণেই না মা-বাবা নাম রেখেছিল নিরাময়! পুরোনো মরে যাওয়া দিনের চুকেবুকে যাওয়া ছায়াগুলো আজকাল রসিকতা করে যায় ভর সন্ধ্যেবেলা। কার্নিশের পড়ন্ত আলোর গভীরে এসে বলে, 'মানুষের থেকে বেশি গঞ্জনাময় তার ভাষা।' নিরাময় ছায়াছাদের ফিশফাশ শুনে ভাবে, মানুষের নাম নিরাময় হলেও ভাষার নাম নিরাময় হওয়া সম্ভব নয়। 

"খুঁজে পাওয়া যাবে না যে দিন 
রাতপাতাল"

একটা জীবন গঞ্জনা করে আর শুনে কেটেই গেল তবে! নিরাময়ের দিন শেষ হয়ে এসেছে। একথা সে ভালোভাবেই জানে। দিন শেষ হয়ে এলে ছায়াদের কথাবার্তা বেড়ে যায়। সঙ্গে থাকার বলতে তো এইসব ছোট হয়ে আসা আলোর মত ছায়াদল। প্রতিটা ছায়া নিরাময়ের চেনা একেকটা মানুষ যারা এক এক করে তাকে ছেড়ে গেছে। ছেড়ে যাওয়ার এই অন্তহীন পসরা, তার জীবন। অক্ষম জীবন পারঙ্গম করে গেছে জীবনকে, নিরাময়কে করেছে অসুখী। ছায়াজীবনের অসুখী দোলনায় বসে রয়েছে ভবিষ্যৎহীন বারান্দার মধ্যিখানে। নিরাময়। ছায়াগুলো ওর স্মৃতি নিয়ে লোফালুফি খেলছে। 

"অন্য কোথাও 
জল দাঁড়াবে
নিথর অতল জল" 

নিরাময় আজ তার অক্ষম জীবনের ইতি টানতে এসেছে এই বারান্দায়। বারান্দা মানেই তো তাই। একটা বাড়ি যেটা শেষ হয়ে আসছে, তার নামই তো বারান্দা। এই যে নিরাময়ের জীবন, প্রায় শেষ, সেই ইতির নামও তো তাই। বারান্দা। ছোটবেলা থেকে বুড়োবেলা অব্দি কতকত লোক উঁকিঝুঁকি মেরেছে তার জীবনে। সবাই একেকটা নতুন নিন্দা, নতুন গঞ্জনার অবকাশ নিয়ে এসেছে। অক্ষম নিরাময় তাদের সঙ্গে নিন্দার লড়াইয়ে, গঞ্জনার লড়াইয়ে তালে তাল দিয়ে লড়ে গেছে। আজ ছায়াদের রুখ দেখে নিরাময় বড় দেরিতে বুঝেছে, 'মানুষের থেকে গঞ্জনাময় তার ভাষা।' নিরাময় এখন তার দীর্ঘ অসুখী জীবনের একেকটা চরিত্রকে একেকটা ভাষা ভেবে নিয়েছে।

"গাছের তলায়
আতসবাজি
পুকুর জুড়ে
পিশাচ আর ভীমরতি"

ভাষা ১: "জীবনে কোনোদিন নিজের বাইরে গিয়ে দাঁড়াতে তো আর পারলে না!"

ভাষা ২: "কোনোদিন কাউকে এক মুহূর্তের জন্য সুখ তো দূরস্থান, আনন্দ দিতে পেরেছে কি? "    

ভাষা ৩: "এতো গ্লানি নিয়ে বেঁচে থাকতে ভালো লাগে তোমার?"

ভাষা ৪: "তোমায় তো দেখি যাই বলি না কেন, অসম্মানিত হও না!"

ভাষা ৫: "তুমি একটা ঘৃণ্য লোক। কেউ কোনোদিন তোমার সঙ্গে থাকতে পারেনি, কোনোদিন কেউ পারবেও না।"

ভাষা ৬: "নিজেকে মহান ভাবা ছাড়া জীবনে করেছ কি শুনি?"   

ভাষা ৭: "কারুর প্রতি কোনো দায়িত্ব পালন করেছো কোনোদিন?"

ভাষাগুলো বিস্ময়সূচক আর প্রশ্নবোধকের মধ্যে মারামারি করতে থাকে কার্নিশ বরাবর। সন্ধ্যে পেরিয়ে রাত গড়িয়ে আসে বারান্দায়। ছায়াছাদের কি আর ছায়াবারান্দা হয়? হয় ছাদ হয় নয়তো বারান্দা হয়। হয় জীবন হয় নয়তো মৃত্যু। নিরাময় বরাবর দুটোই চেয়েছে। যতটা ছাদ ততটাই বারান্দা। যতটা জীবন ততটাই মৃত্যু। 

এবার ঝাঁপ দেবার পালা।

ভাষা থেকে। 

গঞ্জনা থেকে। 

জীবন থেকে। 

বারান্দা থেকে। 

নিরাময় ঝাঁপ দেয়। ভাবে, জীবন এবার মৃত্যুময় নয়, বরং স্বয়ং মৃত্যু হয়ে উঠবে। কিন্তু ছায়ারা ঠিক বলেছিল। মানুষের থেকে বেশি গঞ্জনাময় তার ভাষা। একটা গল্প থেকে আরেকটা গল্পে এসে পড়ে নিরাময়। ঝাঁপ দিলে বড়জোর গল্প পাল্টে যায়, আর কিছু পাল্টায় না। অসুখী গল্প থেকে হঠাৎ সুখের গল্পে ঝাঁপ দিয়ে ফেলেছে নিরাময়। নিজের অজান্তে। ভাষা ১ থেকে ভাষা ৭, ছায়া থেকে দূরে আলোর অপেরা হয়ে নেমে আসছে মাঝরাতে। নিরাময় জানে না সুখের ভাষার সঙ্গে, আলোর ভাষার সঙ্গে কি করে কথা কইতে হয়। আলোরা বড়ো হতে থাকে ক্রমশ। নিরাময় কিছু দেখতে পায় না। সে ভাবে, "মানুষের নাম নিরাময় হলেও ভাষার নাম নিরাময় হওয়া সম্ভব নয়।" 

"যে দিন খুঁজে পাওয়া যাবে না
পরাগদুপুর

সে ছায়ায় জল দাঁড়াবে না অন্যদিন।" 

-------------------------------------------------------------------------





image13