সাহিত্য পত্রিকা-ই বলা যেতে পারে...

অভিষেক রায়

হাইকু-নিস্তব্ধতা ও অনন্ত জীবনের আশ্বাস


“মহাকাশ্যপ হেসে উঠলেন

সকলের মাঝে বসে


অসচরাচর বুদ্ধের হাতে

দেখে গোলাপের স্তবক”

            -আহা, ড্রালা, লেখক


আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে একদিন ভোর হয়েছিল, হালকা ও নরম, শ্রাবস্তী নগরে ও বুদ্ধ প্রতিদিনকার মত হেঁটে এসে তাঁর দশ হাজার শিষ্যের মাঝে বসেছিলেন। বুদ্ধ তাঁর ঊনপঞ্চাশ বছর ধর্মপ্রচারের পঁচিশ বছরই এই শ্রাবস্তী নগরে ছিলেন, নিশ্চয়ই সেই শহরের মানুষজন কে খুব ভালোবেসে ফেলেছিলেন। মানুষের চেতনার স্তর খুব উঁচু ছিল শ্রাবস্তীর মানুষজনের- এই কথা এখান থেকে আমরা বুঝে নিতে পারি। অনেক ব্যবসা-বাণিজ্য নিশ্চয়ই হত সেকালে সেই শহরের উপকন্ঠে। বুদ্ধের যত প্রধান সূত্র- বজ্রছেদিকা প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্র, প্রজ্ঞাপারমিতা হৃদয়ম সূত্র সব-ই এখানে তৈরি। কত কত সেরা সব শিষ্যের ভিড় তাঁকে ঘিরে- সারিপুত্র, সুভূতি, মহাকাশ্যপ, বিমলকীর্তি, মঞ্জুশ্রী, রাজা শান্তনু- চাঁদের হাট সেই এক। এখন শ্রাবস্তী একটি নগণ্য গ্রামে পরিণত হয়েছে- তার নাম সাহেত-মাহেত, মানচিত্রে সেই নাম খুঁজে পাওয়া যায় না। অতীতের গরিমা অস্তাচলে। গ্রামের লোককে বুদ্ধের কথা জিজ্ঞাসা করলে হয়তো তারা আড় চোখে তাকিয়ে হাসবে। জীবন বদলে যায়।


 সেই সকালটি ছিল মনোরম। বুদ্ধদেব হেঁটে এসে বসলেন, পা ধুয়ে তাঁর শিষ্যদের দিকে মনোনিবেশ করলেন। তাঁর দিব্যকান্তি, শান্ত, সমাহিত শরীর সেই সময়ের অনেক মনীষী গুরুর ন্যায় দিগম্বর নয়। সুন্দর বস্ত্রাবৃত- ভিক্ষুর সম্বল পীতবস্ত্র। তাঁর নির্বাণের তীব্র পৌরুষের মাঝে এক নারীত্ব ঝলমল করছে। পাশে ভিক্ষাপাত্র- তাতে ভিক্ষান্ন ও মাংসাদি। অপরিশঙ্কিত মাংস, অর্থাৎ যে মাংস সম্বন্ধে তুমি নিঃশঙ্ক যে তা তোমার ভিক্ষার জন্য পূর্বেই প্রস্তুত হয়নি, তা বুদ্ধ গ্রহণ করতে বলতেন। ভিক্ষুগণ তাঁকে তিনবার পরিক্রমা করে যে যার জায়গা নিলেন। সকলে তাঁদের বস্ত্র মনোযোগ সহকারে ঠিক করলেন। বুদ্ধের হাতে একটি পদ্মফুল, কিংবা অনেকে বলেন গোলাপের স্তবক একটি।


বুদ্ধ সেদিন কোনও কথা বললেন না। সবাই চুপ। সূর্যদেব আকাশ বেয়ে উপরে চড়ছেন। পাখিদের ডাকের ধরন দিনের প্রহরের সাথে বদলে যাচ্ছে ক্রমশ। শিষ্যেরা উৎসুক। হালকা চাঞ্চল্য। তবু নিত্য বুদ্ধের মৌনতা গভীর থেকে গভীরতর হয়ে চলেছে। এরকম আগে কখনও হয়নি। শিষ্যেরা বুদ্ধকে অবিরাম কথা বলে যেতে দেখে অভ্যস্ত। বুদ্ধের অমৃত বাণীর সিঞ্চনেই তো তাঁদের মনের বাঁক সোজা-সরল হয়ে উঠেছে ক্রমশ। অন্তরে তীরের মত বিঁধে গেছে এতদিন তাঁর মুখনিঃসৃত প্রবচন। কিন্তু আজ তিনি চুপ- হিমালয়ের চাইতেও নিশ্চল, নির্বাক।


এমনই এক সময়, এমনই এক অপূর্ব মুহূর্তে শিষ্যদের ভেতর থেকে হেসে উঠলেন কেউ। সবাই চকিত হয়ে চাইলেন সেই ব্যক্তির দিকে। ভিক্ষুটির নাম মহাকাশ্যপ। সেই সময়কার বুদ্ধের বন্দিত শিষ্যদের মধ্যে কেউ নন। এমনকি বৃহৎ বৌদ্ধ শাস্ত্রেও মাত্র এই একটিবার এসেছে তাঁর নাম। তাঁর এই হাসি মানুষের চৈতন্যের ইতিহাসে সবচেয়ে অপূর্ব ঘটনা। বুদ্ধের করুণা সেদিন বাঁধ মানেনি। তিনি ইশারায় মহাকাশ্যপ কে ডেকে তাঁর হাতে তুলে দিলেন সেই গোলাপের স্তবক। দিয়ে বললেন, ‘যা বলা যায় আমি তা সকল সূত্রে সূত্রায়িত করেছি। যা করা যায় তার জন্য তন্ত্রের সাধনার সকল নির্দেশ দিয়েছি। যা বলা যায় না, করার যেখানে উপায় ও প্রয়োজন কিছু নেই, সে সব আজ মহাকাশ্যপ পেল।’ বৌদ্ধ ইতিহাসে এই রহস্যময় ঘটনাগুলো থেকে জন্ম হয় জেন ধর্মের- বুদ্ধহৃদয়ের সরাসরি দীক্ষা, যা অব্যয়কৃতোপদেশ নামে পরিচিত, সেই রহস্যময় দীক্ষার মাধ্যমে মহাকাশ্যপ হন প্রথম জেন গুরু। এই ঘটনা যা পরবর্তীতে শিষ্যদের স্তব্ধ করেছে, যা তাদের ধ্যান লাগিয়েছে, তা Transmission of the Lamp নামেও খ্যাত। ‘জেন’-শব্দটিই আসে সংস্কৃত ‘ধ্যান’ বা পালি ‘zan’ থেকে, যা চীনে chan(‘চ্যান’) হয়ে অবশেষে জাপানে zen(‘জেন’) নাম নেয়। অদ্ভুত মানুষ ছিলেন এই মহাকাশ্যপ। এক অশ্বত্থ বৃক্ষের নীচে নিশ্চুপ বসে থাকাই ছিল তাঁর সাধন। বুদ্ধ থেকে মহাকাশ্যপ হয়ে এক সরু নদীর মত এই ধারা বইতে থাকে। জনমানস থেকে কিছু দূরে, পাহাড়ি নদীর মত একাকিনী কিন্তু চিত্তাকর্ষতায় ভরপুর। জেন ধর্ম কাঠামোগত দিক দিয়ে মহাযান বৌদ্ধ ধর্মের অন্তর্গত। এই জেন ধর্মের ছাব্বিশতম গুরু বোধিধর্ম তাঁর গুরুমা প্রজ্ঞাতারার কথায় ভারতের সীমানা অতিক্রম করে পৌঁছোন চীন দেশে। 


 জেন ধর্মের সমগ্র ইতিহাস অত্যাশ্চর্য ঘটনায় ভর্তি। এই বোধিধর্ম ছিলেন এক বৃহদকায় পুরুষ। চীন দেশে তিনি পৌঁছনোর বহু আগেই তাঁর নাম পৌঁছে গিয়েছিল চীনের সম্রাট য়ু্-র কাছে। চীনে পাঁচশ বছর আগেই বৌদ্ধ ধর্ম পৌঁছে গেছে তবে সম্ভবত কোনও ভারতীয় আলোকপ্রাপ্ত ব্যক্তির আত্মপ্রকাশ সে দেশে তখনও হয়নি। তবে চীন দেশে এক নিজস্ব সুরভী ছিল তাও(Tao)  ধর্মের, লাও সে, চুয়াং জু, লিয়ে জু-দের হাত ধরে। অব্যয়কৃতোপদেশ-এর বাণী সেখানে সুন্দরভাবে তাও ধর্মের সাথে মিশল। চৈনিক জল-হাওয়ায় উভয়েই উভয়কে পরিপুষ্ট করে এক বোধিপ্রাপ্তির বাতাবারণ তৈরি করে সারা দেশ জুড়ে। চীনা ট্যাং রাজাদের আমলে জেন গুরু-রা সেখানে সিংহনাদে মানুষের ঘুম ভাঙাতেন। এখনও চীনা জেন গুরু জোসু-র বাণীসংকলন The Lion’s Roar কিংবা ‘সিংহনাদ’ নামে জনমানসে বিখ্যাত। অবশ্যই ঘুম বলতে এখানে কি বোঝাচ্ছে তা সব পাঠকের কাছে সমান অর্থে ধরা দেবে না।


জাপানের এইসাই চীনে এসে জেন শিক্ষা ও গ্রিন টি নিয়ে দেশে ফিরে নিজের মতো করে সেখানে ধর্মটিকে বাড়িয়ে তুলতে থাকেন। যা ভারতে ছিল বীজমাত্র, চীনে অঙ্কুরোদ্গম ঘটে জাপানে ফুলে-ফলে ভরে ওঠে। ও জাপানে এই ধ্যান প্রক্রিয়ায় এসে যুক্ত হয় নানাবিধ কলাকৌশল- ক্যুডো বা ধনুর্বিদ্যা, সামুরাইদের তরোয়ালের খেলা(ইয়াডো, কেনডো), নানারকমের মার্শাল আর্ট এমনকি সামুরাইদের বিপদকালীন অবস্থায় আত্মহত্যা করার যে কৌশল সেই ‘হারাকিরি’-র ওপরেও জেন ধর্মেরই প্রভাব রয়েছে। নাভির দুই ইঞ্চি নীচে যে বিন্দুটি তার নাম জাপানী ভাষায় ‘হারা’, মৃত্যুর সময় স্পন্দন শেষ পর্যন্ত শরীরের ওই বিন্দুটিতে থাকে। বিপদকালীন অবস্থায় সামুরাইরা তরোয়ালের এক কোপে নিজেদের হারা কেটে বের করে দিতেন। মোক্ষম ও অব্যর্থ।


সুতরাং এটা খুব-ই স্বাভাবিক ব্যাপার যে জাপানীদের কবিতাও মোক্ষম ও অব্যর্থ হবে। তাকে চিনে নিতে হবে হাজার হাজার বছর ধরে পড়ে থাকা পাথরগুলির নিস্তব্ধতার সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে। ও হারাকিরির পরিণামের মত শান্তিপ্রদ, কিন্তু অনন্ত জীবনের আশ্বাস যেখানে। হাইকু যেরম।


হাইকু, বিশেষ করে সাবেকি হাইকু, প্রকৃতির টুকরো টুকরো ঘটনাকে তুলে ধরে তার ভেতর দিয়ে অসীম ধ্যানের নির্দেশ দেয়। আমাদের ব্যক্তিমনন আমাদের কে সত্যকে বুঝতে দ্যায় না। কৃষ্ণমূর্তি যাকে বলেছেন That which is. যা আছে তাই সত্য কিন্তু অস্থির মন তার হদিশ পায় না। এখানে ফরাশী কবি পল এলুয়ারের কথা মনে আসতে পারে যিনি বলেছেন আমাদের চেনা জগতের এক সমান্তরাল জগত আছে কিন্তু তা অন্য কোথাও নয়, এই জগতেরই ভেতরে কোথাও রয়েছে। হাইকু তার গঠনে ও কাব্যিকতায় অন্তরের তারে এমন সুর তুলে দ্যায় যে সেই উপলক্ষ্যে সত্য এসে আমাদের কে ধরা দিতে পারে। যে মানসিক বাড়ি আমরা তৈরি করেছি তা শাশ্বতের আলো-হাওয়া পায় না, তখন এরম একটা হাইকু,


একটা ছোট্ট কাঁকড়া 

উঠে আসছে আমার পা বেয়ে

কি ঠান্ডা জল!


তৎক্ষণাৎ বিচারবুদ্ধির লয় ঘটাতে পারে ও এক অন্তর বিপ্লবের সাথে সাথেই সূর্যের আলোর মতো শাশ্বত সত্য এসে চোখে পড়তে পারে- that which is.


বৌদ্ধ দর্শন বলে বুদ্ধ নির্বাণ প্রাপ্তির পর ঊনপঞ্চাশ দিন বাকরুদ্ধ ছিলেন। এমনই অত্যাশ্চর্য ঘটনা ঘটেছিল তাঁর সাথে, তিনি সাধারণের ভেতর পরমপ্রজ্ঞা দর্শন করে মহাসুখ লাভ করে চুপ করেছিলেন সেই সময়কাল। অনন্ত জীবনের আশ্বাস তাঁকে হতবাক করেছিল। এইদিকে গৌতম বুদ্ধের কথা বলা জরুরি ছিল কারণ তাঁর মুখনিঃসৃত অমৃতবাণী বহু মানুষকে এনে দেবে মুক্তির স্বাদ- দৈব বাণী নাকি এরকমই ছিল। গৌতমের এই দীর্ঘ মৌনে নাকি তাই দেবতারাও চঞ্চল হয়ে ওঠেন। বুদ্ধ শেষমেশ কথা বলেন ও তাঁর জীবনের অবশিষ্ট ঊনপঞ্চাশ বছর অবিরাম কথা বলে চলেন। কিন্তু কোনও আধিদৈবিক প্রশ্ন, যেমন ঈশ্বর আছেন কিনা, এইরকম প্রশ্নের উত্তরে তিনি চুপ করে থাকতেন। সত্য যা তা বলে দেওয়া কখনও সম্ভব নয়, একান্তে উপলব্ধির বিষয় ও সেখানে বিচারবুদ্ধিপূর্ণ ভাষার জালের কোনও উপযোগিতা নেই- এরকমই হয়তো ছিল তাঁর মৌনের অর্থ। শূন্যতা উপলব্ধ হলে- ভিতরে খালি পাত্র তৈরি হলে তা পরমপ্রসাদে ভরে যায়, মুখে কিছু বলা যায় না সেই অবস্থার কথা। যথা উর্দু শায়রী-


‘দিওয়াঙ্গি সে কাম লিয়া

অর পী গেয়ে

 বে-এক্তিয়ার জাম লিয়া

অর পী গেয়ে’ 


জেন ধর্ম আরো এগিয়ে গিয়ে বলে বুদ্ধ তাঁর ঊনপঞ্চাশ বছরের বাঙ্ময় জীবনেও নাকি একটা কথাও বলেননি! যা বলেছেন তাও ওই ব্যাঙের লাফের শব্দের মত পুকুরের নিস্তব্ধতাকেই আরো গাঢ় করে-


পুকুর পাড়

 ব্যাঙের লাফ

জলের শব্দ


এই বাঙ্ময় নিস্তব্ধতাকেই আমরা খুঁজে পাবো সাবেকি জাপানী হাইকুর সমস্তটা জুড়ে।


An old man

Infirm with age

Slowly sucks 

A fish bone


বৌদ্ধ ভিক্ষু সারিপুত্র অবাক করেছিলেন সবাইকে যখন বুদ্ধের এক দীর্ঘ ভাষণের পর প্রশ্ন করেছিলেন, ‘বুদ্ধদেব, আপনি সমস্তটা সময় চুপ করে থাকলেন কেন?’


 You make the fire

I will show you something wonderful

 - A big ball of snow    


বলাই বাহুল্য, এই নিস্তব্ধতা জন্ম দেয় এক অবাক বিস্ময়ের। 


জাপানে হোক্কু নামক কবিতার ফর্ম থেকে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে হাইকু। রেঙ্গা নামক দীর্ঘ কবিতা শুরু হত এই হোক্কু দিয়ে। কবিতা লেখা শেখার জন্য রীতিমত নাড়া বেঁধে অনুশীলন চলত তরুণ কবিযশঃপ্রার্থীদের। হাইকুর জন্য প্রয়োজন হত সর্বপ্রথম খাঁটি কবিপ্রতিভা, ছন্দজ্ঞান ও ধ্যানাভ্যাস। কয়েকজন প্রথিতযশা হাইকু কবির নাম-

মাৎসুও বাশো, ইয়োসা বুসোন, মাসাওকা শিকি, কোবায়াশি ইশা প্রমুখ। হাইকু লেখার সাথে সাথেই হাইগা নামক এক চিত্র মাধ্যমে হাত পাকাতেন তখনকার জাপানী শিল্পী-সাহিত্যিকরা।


হাইকুর আরো একটা দিক আছে যা অদীক্ষিতের পক্ষে বোঝা মুশকিল, তবু আমরা সেদিকেও কিছুটা আলোকপাত করব। মনে রাখা দরকার এইখানে যে এই ধরণের আলোচনা কিন্তু পূর্ণিমার থালার মত চাঁদটাকে পাঠকের কাছে উপলব্ধ করে না, সেই চেষ্টাও তাঁর নেই, কিন্তু চাঁদের দিকে আঙুল করতে পারে নিশ্চিত। জেন ধর্মে যেরম সব প্রদত্ত শিক্ষা সম্বন্ধে বলা হয়- Fingers pointing to the moon.  একদিন পাঠক আর সেই আঙুলের দিকে না তাকিয়ে চাঁদটার দিকেই তাকাবে, এই আশায়।  


১। যখন ওয়াকুয়ান বোধিধর্মের একটি দাড়িওয়ালা ছবি দেখেছিলেন, তিনি অভিযোগ করেছিলেন, ‘ওই লোকটার দাড়ি নেই কেন?’

 

২। যতই সারাদিন তুমি খাবার খেয়ে চল, এক দানা খাদ্যও তোমার মুখের ভেতরে যায়নি।

           -হুয়াং পো 


এত অবধি পড়ে পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটতে পারে। কারণ পাঠকের হয়তো দাড়ি আছে, তিনি হয়তো খেতে ভালোবাসেন! এইসব পাগলামো তাই তিনি কোনও মতেই বরদাস্ত করতে পারবেন না। অথচ জেনের বাইরে দাড়ি গজাতে পারে, সে বাইরে খাদ্য গ্রহণ করতে পারে কিন্তু অন্তঃস্থলে তার চিরহরিৎ নিস্তরঙ্গতা। এই ধরণের কথাবার্তা জেন মহলে অহরহ প্রচলিত ছিল যাকে বলে কোয়ান। ক্ষেত্র প্রস্তুত থাকলে এইসব কোয়ান শিষ্যের সমস্তটা চুরমার করে তার ভেতরের শুধুমাত্র শাশ্বত নির্বাণের জ্যোতিকে, তার বুদ্ধকে প্রকট করবে। যে শাশ্বত আমাদের মধ্যেই আছে ও যার দাড়িও গজায় না, যে খাবারও খায় না। এই শাশ্বত অবশ্য সকলেরই অন্তঃস্থলের জিনিস কারণ শাশ্বতের অর্থই যা কখনও হারায় না। 


হাকুইনের Song of Meditation-ও শুরু হচ্ছে এইভাবে-

All beings are buddhas from the very beginning.


 হাইকুও তাই এত সংহত, ৫-৭-৫ ছকে শুধুমাত্র সূত্রটুকু পাঠককে ধরিয়ে দেওয়া তার কাজ। উপমাই কবিত্ব, এই কথা হাইকুর ক্ষেত্রে খাটে না। যেই সময়ে বাংলায় রচিত হয়েছে মঙ্গলকাব্য ও বৈষ্ণব পদাবলী, মনে রাখা দরকার জাপানে হাইকু লেখা হচ্ছে মোটের ওপর সে সময়। সুতরাং বাংলা ও জাপানী সংস্কৃতির পার্থক্য নজর করে বাংলায় ৫-৭-৫ ছকে হাইকু লেখার চেষ্টা তেমন যুক্তিসঙ্গত নয় মনে করা যায়। ভাবতেও অবাক লাগে পৃথিবীর অন্যান্য ভাষায় অনুকবিতা লেখার প্রচেষ্টা পঞ্চাশ-ষাট বছরের বেশি পুরনো নয়। আর জাপানে তা লেখা হয়েছে পাঁচ-ছ’শো বছর আগে। ন্যারেটিভ ও তৎসংক্রান্ত সংস্কৃত কাব্যের রসতত্ত্ব তৈরি হওয়ার কোনও জায়গাই হাইকুর ভেতর নেই। শুধু essential-টুকু নিয়েই তার কারবার। মাইকেল অ্যাঞ্জেলো যেমন একবার বলেছিলেন যে একটি পাথর তাকে ডাকছিল, গিয়ে তিনি দেখলেন যে সেই পাথরের ভেতরে ডেভিড। তখন তিনি সেই পাথরের অদরকারী অংশটুকু কেটে বের করে দিলেন। মনস্তত্ত্বের অসাড়টা ফেলে দিয়ে সারটুকু গ্রহণ করে হাইকু। যেটুকু একেবারে শুরু-র সময় থেকেই বুদ্ধ শুধু সেটুকুই। এখানে অনস্বীকার্য যে হাইকু আশ্চর্যজনক ভাবে কালোত্তীর্ণ। বহু আগের কবিতা পড়ার রীতি এখন কবিদের ভেতরেই নেই। অথচ দেখি মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর সময়ে পড়ে ফেলেছেন এমনকি গ্রিক কবি হোমার-কে। নেহাৎ অ্যাকাডেমিক আগ্রহে না হলে আমরা আজ বাংলা-ইংরেজিরও পাঁচ-ছ’শো বছর আগের লেখালেখি তেমন পড়ি কি? অথচ হাইকু শুধু পড়ি না, তাঁর কবিদের নিজেদের সময়ের শ্রেষ্ঠ কোনও কবি বলেও মনে হতে পারে। অধুনান্তিক সময়ের যে ওপেন-এন্ডেডনেস, তাও হাইকুর ভেতর সমগ্রমাত্রায় সচল। এ এক বিস্ময়, অপার, অচ্যুত বিস্ময়বোধ। জাপানের কবিরা কি এক আশ্চর্য অ্যালকেমি-তে দখল করলেন কবিতার বিশ্বসভার মহার্ঘ এই আসনটি ও মাৎসুও বাশো হেঁটে এসে বসলেন দান্তে-গ্যেয়টে-রবীন্দ্রনাথের পাশে।


জাপানী ভাষা পিক্টোরিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ, তার কোনও বর্ণমালা নেই। হাইকুর ৫-৭-৫ ছকও সেই প্রেক্ষিতে দেখা উচিত বলে মনে হয়। এখন বাংলায় হাইকু প্রভাবিত লেখা লিখতে গেলে গঠনতত্ত্বের চেয়ে বেশি করে গুরুত্বপূর্ণ নির্যাস বা ‘হাইকু মুহূর্ত(Moment)’- এরম মনে হয়। এইধরণের প্রচেষ্টায় সাফল্যের সম্ভাবনা বেশি, কারণ বাংলা ও জাপানি ভাষা পুরো ভিন্ন প্রকৃতির হলেও বাঙালি ও জাপানি মনন দুই-ই বৌদ্ধউর্বর। বস্তুত বাংলায় মঙ্গলকাব্যের আগের যুগটিতে, বৌদ্ধ-শৈব তটস্থ যুগের যে বজ্রজান, যে বজ্রতারার উপাসনা তা কাঠামোগত দিক দিয়ে জেনেরই মত মহাযানের অন্তর্গত। যেখানে হীনযানের উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত নির্বাণ অর্হৎঅবস্থা লাভ, মহাযান বোধিস্তত্বাবস্থার কথা বলে যা জনমানসকে সাধকের করুণার দ্বারা নির্বাণের দিকে ত্বরাণিত করে। বাংলায় বিশেষ করে পাল আমলে বজ্রযান ব্যাপক প্রসার লাভ করে। শোনা যায় পাল রাজাদের পতাকায় তারার ছবি অঙ্কিত থাকত- ও সেই সময়টিকে কিছু ঐতিহাসিক বাঙালির স্বর্ণযুগও বলেছেন। এখনের দুই বাংলায় ছেয়ে থাকা সহজিয়া গোষ্ঠী আউল-বাউল-ফকির-দরবেশ-কর্তাভজারাও বৌদ্ধতন্ত্রেরই ঝটতিপটতি। তফাৎ এটুকুই- ভারতে আধ্যাত্মিক বিকাশের ক্ষেত্রে একটি ক্রমিক পদ্ধতি সাধারণত নেওয়া হয়েছে, তাই বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের চর্যাপদকে আলো-আঁধারির ভাষা বলা হয়েছে, কিন্তু জাপান এক ধরণের অক্রমিক বিকাশে ঐতিহাসিকভাবে আস্থা রেখেছে, তাই তাঁর হাইকু শুধুই আলো যা সমস্ত আঁধারের অবসান ঘটায় ও বিভ্রান্ত মানুষ অবশেষে যা আছে তার খোঁজ পায়- that which is.


এই আলোচনার প্রেক্ষিতে এইবার লেখকের কিছু হাইকুধর্মী কবিতা পেশ করা হবে। গঠনগত দিক দিয়ে হাইকুর দাবি নেই, যতটুকু দাবি তা তার নির্যাসে। প্রথম হাইকু শুনেছিলাম মৃণাল সেনের জাপান ভ্রমণ প্রসঙ্গে এক লেখায়, ব্যাঙের লাফ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের তিন লাইনের পদ্যের অনুবাদে হাসি-ঠাট্টা কম করিনি। সেখানে কোথায় কবিতা, তা বুঝতে বস্তুত আরো অনেক ম্যাচিওরিটি প্রয়োজন ছিল। এক সন্ধ্যায় গঙ্গার ঘাটে বসে বসে এইসব আলোচনা হচ্ছিল। দূরে হাওড়া ব্রিজের মাঝের আলোগুলো নিভে গেছে অথচ দু’পাশের আলোগুলো জ্বলছে। ফলে মনে হচ্ছিল সেতুটির মাঝখানের অংশটি মুছে গেছে, এরকমই মনে হচ্ছিল দূর থেকে।


১।।


ফুটফুটে

রাত্রি এখন


একে একে

ঝড়ে পড়ে


চিন্তারা


শিউলি গাছের নীচে


পড়ে থাকে

ক্যাম্পখাট 


২।।


ঝটপট

শাদা পায়রা


শান্তি

বিনষ্টকারী


অন্ধকারে


অপেক্ষা

সূর্যের


৩।।


ইশারাভিমুখে

মিলনের


থেমে গ্যাছে

সভ্যতা


মৃত্যু ও কলসী


ঠান্ডা আগুন

গ্রাম্য বাতাস


হঠাৎ!


৪।।


চন্দনকাঠ


ভাই ফোঁটার

স্মৃতি-তে


মন কেমন

করা


আকাশ

উল্লঙ্গ


পড়েছে

শিশির


৫।।


সচেতন

হয়ে উঠছে


দুব্বো ঘাসেরা


পায়ে জড়ায়

ঠান্ডা শিশির


অনন্ত জীবনের আশ্বাস


চা-এর ডাক

কি করছ


৬।।


শান্তিনেকতনি

পাথর


পড়ে

আছে


ওপরে

বসা হল


কিছুক্ষণ


এক আকাশ আলস্য


৭।।


দুপুরের 

কিছু মুহূর্ত


সবচেয়ে সাধারণ


স্নানের

নিমিত্ত


বইছে

নদী   



[[আচার্য রজনীশের জেন পোয়েটিক্সের ওপর প্রদত্ত ভাষণ ও সুজুকির বইয়ের কাছে ঋণ স্বীকার।।]]

image8