সাহিত্য পত্রিকা-ই বলা যেতে পারে...

অভিষেক মুখোপাধ্যায়

ইউরোপের ডায়েরী


আজ এখানে ঠান্ডা। ঠান্ডার দিনে যে একটা বাজে হাওয়া দেয়, সেই হাওয়াটা আমায় পারি শহরের কথা মনে পড়ায়। এই নয় যে প্যারিসে আমি ভয়ংকর ঠান্ডায় কেঁপেছি। কিন্তু পারি পৌঁছনোর আগের দিন রাতের ব্রাসেলস নর্থ স্টেশনের সামনে আড়াইটে অব্দি ফুটপাতে বসে ঠাণ্ডা হাওয়ায় কাঁপা আমার প্যারিস যাত্রার গায়ে চিরকালের মতো লেগে রয়েছে। পরদিন ভোরবেলা পারি পৌঁছে অবশ্য প্রায় বিশ কিলোমিটার ঘামতে ঘামতে হাঁটতে হয়েছে, কারন যেখানে থাকার কথা তার মালিক রাত আটটার আগে কাজ থেকে ফেরেননা। আমি মধ‍্যবিত্ত বাঙালি সন্তান, এই ফাঁকে মেট্রো ভাড়া বাঁচিয়ে শহর দেখবো ভেবে বসলাম। ভোরের পারিতে তখন দোকান খুলছে। রাস্তার পাশে পাশে নোতর দাম গির্জা, ল‍্যুভ, সঁ মিশেল, ভোরের শেইন নদী দেখতে দেখতে আমি এগিয়ে গেছি আইফেল টাওয়ারের চূড়ো ধরে। যেখানে ছিলাম তা পারির শহরতলী। ন‍্যুডিস্টদের সাথে জীবনে প্রথমবার। প্রথমবারের অস্বস্তি কাটিয়ে বন্ধুত্ব। আর এভাবেই তাদের সঙ্গে থাকতে থাকতে আর একটু মানুষের কাছাকাছি পৌঁছতে পারা। এমন করেই দেখি আমায় ভ্রমণ বাঁচিয়ে দিয়েছে বারবার।

একা ভ্রমণ আপনার কাছে গোয়েন্দা হওয়া প্রত্যাশা করে। পারিতে সার্ত্রের বাড়ি খুঁজে বার করা, এমনই এক অনুসন্ধান। সার্ত্রের বাড়ি এত সাধারণভাবে রয়েছে যে আপনি সহজে তাকে আলাদা করতে পারবেন না। সাধারণ একটা বাড়ি। তাতে অনেক বারান্দা। আর তার নিচে প্রচুর দোকান ভিড় জমিয়েছে। প্রবন্ধ, খবরের কাগজের ইন্টারনেট সংখ্যা পড়ে, ছবি দেখে এবং অবশেষে ঠিকানাও জোগাড় করে যখন সেখানে পৌঁছলাম তখন বিকেল পড়ে এসেছে। তার আগেই অবশ্য সিমন-সার্ত্রের কবরের সামনে কিছুক্ষণ বসে থেকেছি। 

এই কবর দুটো একসাথে। সার্ত্রের নাম ভুল উচ্চারণ করে, প্রায় আধঘন্টা চক্বর খেয়ে; শুধুমাত্র সিমনের নামের সঠিক উচ্চারণটা জানার কারণে আমি কবর দুটিকে দেখতে পাই। 

প্রতিটা কবরখানার কিছু মায়া আছে। দেখবেন, কবরগুলো কাদের জানা নেই; কিন্তু তাদের পাশাপাশি হেঁটে যেতে ভালো লাগে। শান্ত লাগে। এই কবরখানায় বোদলেয়ারও শুয়ে আছেন। তার কবরের কাছে এলে কেন জানিনা, তার একাকীত্বকে মাপা যায়। অথচ সে কবর সেদিন ভরে ছিল ফল ফুলের ভেতর। তার পাশে বসে থাকতে ইচ্ছে করে অনেকক্ষণ। 

Montparnasse কবরখানা থেকে বেরিয়ে গুগল ম্যাপে ঠিকানা বার করে হাঁটতে হাঁটতে যখন সার্ত্রের বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছলাম, বিকেল হতে চলেছে। গুগল ম্যাপ সঠিকভাবে সেই বাড়ি খুঁজে পাচ্ছে না। এমন অবস্থায় শেইন নদীর ধারের এক ছবি আঁকিয়ে ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে সেই বাড়ির সন্ধান দিলো। বাড়ির সামনে যখন দাঁড়ালাম তখন বিকেল প্রায় শেষ। এরকম সময়ই হয়তো সার্ত্র সিমনের সাথে দেখা করতে সামনের কফিশপে যেতেন। পারির বিকেল মনোরম। আমি উল্টোদিকের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে প্রায় আধঘন্টা শুধু সেই বাড়ি দেখেছি আর বুঝেছি প্যারিস কেন প্রেমের শহর।

ইউরোপে প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা, অন্তত আমার ক্ষেত্রে, ছিল ভয়ঙ্কর। হাজার খানেক টাকা বাঁচাবার ফন্দিতে আমি কোন ধরনের ইন্টারন্যাশনাল সিম কার্ড ছাড়াই ইউরোপের পথে পা বাড়িয়েছি। সেই সময় আমার বিশাল আত্মবিশ্বাস। ভাবছি, চীনে যখন কাটিয়ে এসেছি চার মাস, ইউরোপে তো কোন সমস্যা হওয়ার কথা নয়। অন্তত ইংরেজি ভাষাটা সবাই বুঝবে। আর নিশ্চিত হয়ে বসে আছি ইউরোপে সর্বত্র ওয়াইফাই থাকবে। হ‍্যাঁ, ওয়াইফাই অবশ্যই আছে সেখানে। মেট্রো স্টেশন বা ট্রাম স্টেশনে আধ ঘন্টার জন্য পাওয়া যায়। 

এআইআর বিএনবিতে বাসা ভাড়া করা ছিল। স্টেশনে নেমে, হেঁটে প্রায় দু'কিলোমিটার। উত্তর কলকাতার বাঙালি আমি, চায়ের দোকান-পানের দোকানে ঠিকানা জিজ্ঞেস করে অভ্যস্ত। মেট্রোতে ম্যাপটা খুলে, তার আগাপাশতলা বুঝতে না পেরে, যখন বাইরে বের হলাম দেখি রাস্তার দোকান বলে কিছু নেই। খাঁ খাঁ করছে চতুর্দিক। দু তিন জন লোক হেঁটে যায়। তাঁদের কিছু জিজ্ঞেস করলে মাথা নেড়ে পালায়। মনে মনে প্রস্তুত হচ্ছি ফুটপাতে রাত কাটাতে। এমনসময়, এক বৃদ্ধা মহিলার দেখা মিলল। ভদ্রমহিলা চুপ করে বসে ছিলেন বাস স্ট‍্যান্ডে। কেন জানিনা, মন বললো এনার শরীরে একটু মায়া দয়া আছে। তিনি মন দিয়ে ম্যাপ দেখে আমায় শিখিয়ে দিলেন যে ওপরের ছোট্ট দাগটা হল মেট্রোর পাশের ব্রিজ; যেটা পেরিয়ে আমায় যেতে হবে। তারপর অনেক হেঁটে; ছোট্টো গ্যারেজের লোক ও ফলওলাকে জিজ্ঞেস করে; গন্তব্যে পৌঁছানো। আমার হোস্ট ছিল রোমানিয়ান সেই ছেলেটি। ইউরোপে আমার প্রথম বন্ধু। ব্রাসেলসের একটা সকাল আমরা পাশাপাশি বসে সিগারেট খেয়েছি সিটি সেন্টারে। 

অ্যান্টওয়েপ যাবার আগে বিদায়ের সময় সে বলেছিল সে তৃতীয় বিশ্বে ফিরে যেতে চায় আবার। ইউরোপ তার সারল্যকে খেয়ে ফেলেছে।

মুর্শিদ প্রথমে শুনে হেসেছিল; তারপর আমি সিরিয়াস শুনে রেগেমেগে বলেছিল "একশ ইউরোতে ইউরোপ ঘুরবে!! তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে।" অ্যান্টওয়েপে সেদিন আমাদের শেষ দিন। আমি আর মুর্শিদ রুবেন্সের বাড়ি ঘুরে, রাস্তা দিয়ে হাঁটছি। সামনে দোকানের পর দোকান পেরিয়ে যাচ্ছে; আমরা খেতে পারছি না। আমাদের লক্ষ্য তখন তুর্কিদের ছোট ছোট খাবারের দোকান। সেখানেই একমাত্র সস্তায় খাবার পাওয়া যায়। 

তার আগে সুপার মার্কেট থেকে রুটি আর কোল্ডড্রিংক কিনেই আমি আর মুর্শিদ চলে গেছিলাম অ্যান্টওয়েপ পোর্টের কাছে। সেখানে মুর্শিদের ক্যামেরায় তার ছবি তুলতে গিয়ে আমাদের কোল্ডড্রিংকের দু'লিটারের বোতল ছিপি বন্ধ অবস্থায় জলে পড়ে যায়। আমরা পোর্টের সামনের রাস্তার মাঝে, বসে বসে গল্প করি।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। এমন অবস্থায় আমি আর মুর্শিদ অ‍্যান্টওয়েপ রেল স্টেশনে। মুর্শিদ যাবে নেদারল্যান্ডস আর আমি ব্রাসেলস। সেখান থেকে গভীর রাতের বাসে আমার প্যারিস যাত্রা। স্টেশনে বসে থাকাকালীন এক ব্যক্তি এসে পরিচয় করেন। তার নাম আলমগীর। বাংলাদেশের মানুষ। এখন নেদারল্যান্ডসে থাকেন। আলমগীর বলেন "যোগাযোগ রাখবেন"। সে যোগাযোগ আর রাখা হয়নি। ক'দিন আগে তার নাম্বার দেখেছিলাম মোবাইলে সেভ করা। আজ দেখতে গিয়ে দেখি, নাম্বারটা কখন উড়ে গেছে।

প্যারিসের রাস্তায় বিখ্যাত শেক্সপীয়ার এন্ড কোম্পানীর বইয়ের দোকান থেকে বেরিয়ে যখন খাবারের সন্ধানে হন্যে হয়ে ঘুরছি; আমি তখন মুর্শিদের কথা ভাবছিলাম। জীবনে প্রথমবার খাবার কিনতে না পারার অসহায়তা, সেদিন বুঝি আমি। রাস্তার পাশে সারি সারি খাবারের দোকান। অসাধারণ সব খাবার। মানুষ বসে আছে প্যারিসের ফুটপাতের সাজানো চেয়ারে। তাদের হাতে ওয়াইনের গ্লাস। প্লেটে সাজানো মাসেলস্, স্টেকস্, স্ট্রোগেনফ। কিন্তু আমার কেনার সামর্থ্য নেই। আমি একের পর এক খাবারের দোকান পেরিয়ে যাচ্ছি আর খুঁজে বেড়াচ্ছি সেই তুর্কি খাবারের দোকান। 

প্যারিসের ঝলমলে রাস্তায় আমি সেদিন দারিদ্র্য দেখেছি। এক ময়লা জামা-টুপি পরা ভবঘুরে লোক তার দুই কুকুর নিয়ে সেই খাবারের গলিতে ঢুকতে গেলে মানুষ তাকে আটকেছে; দুর দুর করে তাড়িয়ে দিয়েছে। সে ফিরে গেছে তার মাথা নিচু করে। শুধুমাত্র তার ছোট ছোট কুকুরগুলো গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে আমাদের মনুষ্যত্বকে পেরিয়ে তাদের প্রতিবাদটা জানিয়ে রেখেছে।

প্রতিটা ভ্রমণ আপনাকে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে আসে। 

ব্রাসেলসের প্রথম দিন আমি যখন শহর ঘুরতে বেরোই, আমার কাছে না ছিল গুগলম্যাপ, না ছিল হারিয়ে গেলে ফোন করার জন্য কোন ইন্টারন্যাশনাল সিম কার্ড। এমনকি যে বাড়িতে থাকি তার ঠিকানাটাও অমি সঙ্গে নিয়ে আসতে ভুলে গেছি। আমি রাস্তা ধরে ধরে এগিয়ে যাচ্ছি আর ভাবছি হয়তো এর কাছাকাছি খুঁজে পেয়ে যাব দর্শনীয় সবকিছু। অথচ সে শহর আমার ভাষাও জানে না। তারপর হাঁটতে হাঁটতে মানুষজনের ভিড় দেখে দেখে পৌঁছে গেছি নানা রাস্তায়। ব্রাসেলসের দর্শনীয় স্থানগুলোর কাছে। আবার হঠাৎ করে এক রাস্তায় খুঁজে পেয়ে গেছি একা নিঃসঙ্গ চার্চ বা ফুটপাতে মিশে থাকা ফোয়ারার গলি। ফেরার পথে যে মহিলার সাথে দেখা হয়েছিল, আমার আজও তাকে মনে আছে। তিনি আমায় বলেছিলেন প্যারিসের কোথায় কোথায় আমার যাওয়া উচিত। আমার চিন্তা দেখে বলেছিলেন 'আমিও তো ফ্রেঞ্চ। আমার সাথে কি কথা বলতে অসুবিধা হচ্ছে!' তার সাথে কথা বলে বুঝেছিলাম সব সময় গুগলম্যাপের দরকার নেই।

অ্যান্টওয়েপের সেই দম্পতিকেও মনে পড়ে যাদের সাথে রাতবিরেতে আমার দেখা। আমি ইন্ট্রোভার্ট মানুষ। বন্ধুদের বাজে কথা বলে; তাদের সাথে খেতে না গিয়ে; রাতবিরেতে আমি সেদিন শহর দেখছি। অ্যান্টওয়েপ শহরে সেদিন তুমুল বৃষ্টি। ছাতা হাতে শহরের সিটি সেন্টারে ঘুরে বেড়াচ্ছি, এমন অবস্থায় এক বৃদ্ধ দম্পতি আমার সামনে হাজির। ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করে বসলেন 'কার ছাতাটা সুন্দর বলুন তো।'

আমার মনে আছে নাজিম তুল্লাহকে। সেদিন প্যারিস থেকে ব্রাসেলস ফেরার বাস। আমার বাসা শহরতলীতে। প্যারিস যেতে ট্রেনের প্রয়োজন। স্টেশনে পৌঁছে দেখি সেদিন কাউন্টার বন্ধ। কোন মেশিনও কাজ করছে না। এদিকে ওই ছোট্ট শহরতলীতে প্রায় সবার কাছেই কার্ড। আমি প্রায় দিশেহারা। এই সময় এক ফ্রেঞ্চ যুবক আমার কাছে এসে বলে তার কার্ড দিয়ে আমি যেন ভেতরে ঢুকে ট্রেনে করে চলে যাই। তারপর গন্তব্য স্টেশনে গিয়ে বোঝা যাবে। বিদেশ বিভুঁইয়ে আমার সেই সাহস হয় না। টিকিট ছাড়া ফরাসি দেশে ট্রেনে উঠে ফাঁসব নাকি! আমার সমস্যা দেখে সেই ছেলে আমায় সঙ্গে নিয়ে ট্রামে উঠে চলে প্যারিসগামী মেট্রো স্টেশনের দিকে। ট্রামে বসে আমরা গল্প করি। সে পরিবেশ বিদ্যার ছাত্র। বাড়ি এই শহরতলীতে। নাজিম তুল্লাহ আমায় বলে তার মুসলিম নামের পিছনে একটা গল্প আছে; সে আমায় বলবে। আমার কাছে নাজিম তুল্লাহর ফোন নম্বর আছে; কিন্তু আমাদের আর কখনো গল্প করা হয়নি।

ব্রাসেলসের রাস্তায় রাস্তায় সকাল থেকে ঘুরে বিয়ার কিনতে ঢুকেছি এক ছোট্ট দোকানে। কাউন্টারের দিকে এগোবো, শুনি দোকানদার রেডিওতে খবর শুনছেন। উর্দু ভাষায়। পাকিস্তান বিষয়ক। বিদেশে গেলে নিজের পরিচিত ভাষা শুনলে মন একটু হু হু করেই। কাউন্টারের ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করে বসলাম 'আপনি কি পাকিস্তান থেকে'? ভদ্রলোক চরম গম্ভীর। মাথা নেড়ে না বলে দামটা বলে দিলেন। দাম মিটিয়ে ফিরছি, কি যেন মনে হল; আবার ফিরে গেলাম; জিজ্ঞেস করে বসলাম 'রেডিওতে উর্দু খবর শুনছিলেন তো; তাই আর কি'। ভদ্রলোক আমাকে জিজ্ঞেস করেন 'আপনি কি পাকিস্তানী'? ইন্ডিয়ান শুনে হঠাৎ তার যাবতীয় হাবভাবই পাল্টে গেল। তিনি শুরু করলেন 'ভাই আমি আফগানিস্তানের মানুষ। আপনি হিন্দুস্তানের লোক। আমার ভাইয়ের মতন। পাকিস্তানের দিকে আমরা তাকাইও না '।সেদিন বুঝলাম 'দেশ' 'আপন' 'অপর' আমরা সর্বত্র বয়ে বেড়াই। 

আবার পারিতে ঠিক আইফেল টাওয়ারের নিচে আমার আলাপ হয় বিন আহমেদ খানের সাথে। সে উর্দুতে কারুর কাছে কলম চাইছিলো। আমি এগিয়ে দিতে; সে বলে বসে 'ভাইজান পাকিস্তানের তো'? আমি ইন্ডিয়ান শুনে বুকে জড়িয়ে ধরে, বলে এখানে সকলেই তাকে ইন্ডিয়ান হিসেবেই চিনছে। বিন আহমেদ খান তার বন্ধুর সাথে গোটা ইউরোপ ঘুরছে। নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, বেলজিয়াম ঘুরে শেষে ফ্রান্সে এসে উপস্থিত। সে আরও মাসখানেক থাকবে ইউরোপে। বিদায় নেবার সময় সে বলেছিল 'ভাইজান পাকিস্তান আসুন। দেখবেন আমরা ঠিক আপনাদের মত'। 

সে বন্ধুত্ব আজও ফুরোয়নি।

পারিতে পৌঁছে সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আমার হয় আইফেল টাওয়ারের সামনেই।
 

অ্যান্টোয়েপে আলাপ হয়ছিলো ইন্দোনেশিয়ার মেয়ে ইসাবেলার সাথে। সে আপাতত ইউরোপেই থাকে। পড়াশুনো করে নেদারল্যান্ডসে। পারি যাচ্ছি শুনে সে বলেছিলো সাবধানে যেতে। পারি ঠগবাজদের আড্ডা। তাদের দৌরাত্ব বোঝাতে সে তার বান্ধবীর ঘটনা বলে। তার বান্ধবী আমার মতই ছোটখাটো মানুষ। তখন সদ্য সে পারিতে এসেছে। একদিন সে বেরিয়েছে মেট্রো থেকে হঠাৎ দু’দুখানা ষন্ডা-মার্কা মুশকো সাদা যুবক তাকে ঘিরে ধরে ব্যাগটা কেড়ে নেয়। ব্যাগে পাসপোর্ট ছিলো। অনেক কাকুতি-মিনতি করার পর তারা ২০০ ইউরোর বিনিময়ে ব্যাগটি ফেরত দেয়। অবশ্য এর আগেও পারি শহরের দুষ্কৃতীদের ব্যপারে সিনেমা দেখার ফলে ওয়াকিবহলই ছিলাম। পারিতে যাবার আগে এসব মাথায় নিয়েই বাসে উঠি। 

পারি সম্পর্কে খুব যে উৎসাহের কথা শুনেছি তার আগে, তা অবশ্য বলা যায় না। অ্যান্টওয়েপে আমাদের হোস্ট ডায়না যেমন বলেছিলো ইউরোপের সবচেয়ে সুন্দর শহর হল লন্ডন। তারপরে আসে আমস্টারদাম। পারি অনেক পিছনে এদের থেকে। আমার বন্ধু বেণু ক’দিন আগেই পারি ঘুরে এসেছে অ্যান্টওয়েপ, তার মতে শহর হিসেবে অ্যান্টওয়েপ পারিকে বেশ কয়েক গোল দেবে। সে বলে ‘পারি শহরের বৈশিষ্ট হল সে শহরকে কখনো তুমি আপন ভাবতে পারবেনা’।

প্রথমদিন পারি শহর সকাল-সন্ধ্যে হেঁটে দেখার পর যখন বাসায় ফিরেছি, গল্প করার মতোও অবকাশ ছিলো না। বাসার মালিক সের্গেই প্রস্তাব দেয় বিয়ার খেতে খেতে কলোনির সবার সাথে আলাপ পরিচয় সারার। আমি তাকে আধঘন্টা আরাম করে নিয়ে আসছি বলে সেই যে শুয়েছি, ঘুম ভাঙ্গে পরদিন সকাল আটটায়। এমনকি জামা-কাপড় ছাড়ারও অবকাশ পাইনি! 

পরদিন সকালে লোকাল ট্রেন আর মেট্রো পেরিয়ে পৌঁছলাম আবার আইফেল টাওয়ারের পাশে। সেখানে মানুষ হরেক পসরা সাজিয়ে বসে আছে। কেউ কেউ বিক্রি করছে ছোট-ছোট আইফেল টাওয়ারের আকৃতির চাবির রিং, কেউ নিয়ে দাঁড়িয়ে বালতি ভর্তি শ্যাম্পেনের বোতল, কারুর সাথে আবার টুপি-জামা-কাপড়ের গাড়ি। এগোতে এগোতে দেখি, এক স্প্যানিশ লোক খেলা দেখাচ্ছে। ম্যাজিকের খেলা। তার চারধারে প্রায় আট-দশজন লোক দাঁড়িয়ে। লোকটা একটা বল, একটা বাটির মধ্যে লুকিয়ে দিচ্ছে, তারপর তিনটে বাটি তাড়াতাড়ি করে হাতের কারসাজীতে এদিক-ওদিক নাড়াচ্ছে। তার চারদিকে যারা দাঁড়িয়ে তারা কখনো ঠিক বলে পয়সা জিতছে; আবার কখনো ভুল বলে হেরে যাচ্ছে। এই খেলার একটা সম্মোহনী শক্তি আছে। সামনে থেকে নড়া বেশ কঠিন। এবং প্রতিবারই আপনি দেখবেন, আপনি বলটি যে বাটির নিচে রাখা আছে বলে আন্দাজ করছেন, তা মিলে যাচ্ছে! 

এখন এভাবে টাকা খুইয়েছি যদি আমায় কেউ বলে, আমি তাকে উজবুক ভাববো। কিন্তু আমি নিজে সেই কর্মটি করে ২০০ ইউরো গচ্চা দিয়ে বসি। এবং আমার হাতে ছিলো সর্বমোট ২৫০ ইউরো। এখন ৫০ ইউরোতে যে আমি পারি শহরে মোটামুটি বরবাদ হওয়ার পথে দাঁড়িয়ে, তাতে আর কোন দ্বিমত থাকতে পারে না। বরবাদ মানুষের যেহেতু কিছু হারাবার নেই, অতএব তাদের সাহস বেশী। আমি সেই ম্যাজিশিয়নের পাশে ফুটপাতে বসে পরি ও দাবী করতে থাকি হয় আমায় তার সাথে নিয়ে ঘুরুক বা পয়সা ফেরৎ দিক! তিনি ও তার চারপাশে ঘিরে থাকা সাগরেদরা আমায় নানাভাবে উৎখাতের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে শেষে ১০০ ইউরো ফেরৎ দিতে চায়। এবং তারপরেও বরবাদ কাঙাল বাঙালির সামনে নত হয়ে পুরো টাকা ফেরৎ দিয়ে তাড়িয়ে বাঁচে। 

আমি সে টাকা হাতে নিয়ে যখন হাঁটছি, মনে হচ্ছে নিজের প্রাণ হাতে ফিরে পেয়েছি। তারপর প্রায় একঘন্টা এক পার্কের চেয়ারে বসে থেকেছি। শুধু শান্ত হবো বলে। শান্ত হওয়ার পর আবার খেয়াল হল টাকাটা জালি হলে! চীনে এই জালি টাকা আমাদের অনেক বন্ধুই পেয়েছে ও হায় হায় ছাড়া আর কিছুই করার থাকেনি তাদের! দৌড়ে ঢুকি এক রাস্তার পাশের ছোট দোকানে। সেখানে ওই টাকা ভাঙ্গানোর জন্য প্রায় চারগুণ দাম দিয়ে কেনা, আমাদের ৩৫০ টাকা দামের, সফট ড্রিংস আমার খাওয়া পৃথিবীর সেরা পানীয়! 

ঘরের পাশেই ভার্সাই রাজপ্রাসাদ আবার পারির মূল শহরে পৌঁছলে দেখতে পাবো ল্যুভর। কিন্তু দু’টো একসাথে হবে না! এই দ্বিধা নিয়ে থাকতে থাকতে অবশেষে, মানুষজনের চাপে মূলতঃ, ল্যুভের যাওয়া ঠিক করলাম। 

ইন্টারন্যাশনাল সিমকার্ড না থাকার দরুন রোজ ভোরে উঠে আমায় তখন রিসার্চ সেরে খাতায় লিখে ফেলতে হয়। কোন স্টেশনে নামতে হবে, তারপর কোনদিক দিয়ে বেরোনো, তারপর কোনদিকে কতটা হাঁটা প্রভৃতি। তখন গুগল ম্যাপের জঘন্য আপডেটটাও হয়নি, ফলে আগে থেকে ম্যাপে জায়গাটা চিহ্নিত করে রাখলে, ইন্টারনেট ছাড়াও তা কাজ করে। শুধু তাই নয়, কোন দিকে যেতে হবে সেটাও নির্দেশ করে দেয় ছোট্ট একটি সবুজ তীর চিহ্ন দিয়ে। আমি বাঁহাতি মানুষ। দিকভ্রান্ত। ডানদিক-বাঁদিক বুঝিনা। ফলে ম্যাপ বুঝবো সে আশা করাও বৃথা। সেই ছোট্ট তীর চিহ্ন আর গুগল ম্যাপে নেই। আমি প্রতিদিন এখন পঞ্চাশ থেকে একশ মিটার হেঁটে বুঝি সঠিক দিকে যাচ্ছি কিনা! 

এসব দুঃখযাপনের জায়গা এ নয়, তাই প্রসঙ্গে ফিরি। তো সকাল সকাল সেসব রিসার্চ সেরে বেড়িয়েছি ল্যুভেরের উদ্দেশে। রাস্তায় জল কিনতে যাবো, দেখি ছোট বোতলের চেয়ে বড় বোতল সস্তা! তারচেয়েও সস্তা সাধারণ জলের চেয়ে স্পার্কলিং ওয়াটার! সেই দু’লিটারের, আমাদের টাকায় ২০-২৫ টাকা সস্তা হবার দরুন, বোতল ব্যাগে পুরে, পেট ভরানোর দায়ে কেনা শুকনো বিস্কুটের বড় প্যাকেট নিয়ে আমার ল্যুভর যাত্রা শুরু। 

মেট্রো স্টেশনের নাম ল্যুভরের নামে। ম্যাপ বলছে আমি ল্যুভরের কাছে পৌঁছে গেছি। এমত অবস্থায় আমার সামনে শুধু এক বিশাল বাগান আর তাতে সাজানো অনেক অসামান্য মুর্তি। আমি একবার সেই মুর্তির পাশ দিয়ে গেছি। তারপর ওপরের দিকে উঠে, যেখানে সার-সার চেয়ার সাজানো, বসে দেখেছি সেই অসামান্য বাগান। কিন্তু সময় পেরিয়ে যায়। যাকেই জিজ্ঞেস করি ল্যুভের কোথায়, বলতে পারেনা! ভাবছি অন্য কোথাও চলে এলাম কি! আনন্দবাজার যে জাতির বানান ঠিক করে দেয়, সেই জাতির মানুষ আমি। আন্দাজ হচ্ছিলো উচ্চারণ ভুল হচ্ছে। অথচ ইন্টারনেট নেই যে সঠিক বানানটাও কাউকে দেখাবো। অবশেষে ‘মিউজিয়াম’, ‘মিউজ’, ‘মুজ’, ল্যুভের, ল্যুভ্র ইত্যাদি শব্দ করতে করতে এক মহীয়সী বৃদ্ধা আমার গন্তব্যকে বুঝতে পারেন, আর বলে ওঠেন ‘ওওহহহহ ল্যুভ!!!’

ইউরোপে ঢুকেই যে মানুষটার সাথে আমার প্রথম আলাপ হয় তার নাম ওরেস্তে পাপাদোপোল। রোমানিয়ার ছেলে, জীবিকার সুত্রে ওয়েস্ট ইউরোপে এসে পরেছে। তার বাড়িতে আমার থাকার ব্যবস্থা। ওরেস্তে আমায় যে ঘরে নিয়ে যায়, দেখে চমকে উঠি! এত্ত বই!! এবং সে নিজেও এক বইপোকা, বিশেষ করে প্রাচ্যের ধর্ম ও সংস্কৃতি নিয়ে তার পড়াশুনো চমকে দেবার মতন। আমি ঘরে ঢোকার পড়ে একবারের জন্যও মনে হয়নি যে আমি অচেনা কারুর সাথে দেখা করছি। আলাপের ঘন্টাখানেক পরে সে হঠাৎ আমায় জিজ্ঞেস করে বসে ‘ভারতে তো এত মুসলমান, তাদের সম্পর্কে তোমার ধারণা কি?’ এই প্রশ্নে আমি রীতিমত ঘাবড়ে যাই। একে আমি জানি ইউরোপে ইসলামোফোবিয়ার কেমন আকার, তারওপর সত্যি বলতে কি দিল্লী শহরে থাকতে থাকতে আমার এইসব প্রশ্নে আতঙ্ক ধরে আছে। আমার এখনো ভাবলে ভয় লাগে, যখন একদিন গোভিন্দপুরির কাছে, সেখানে এক সময় থাকতাম সেই স্মৃতিতে; নিজের দাড়িওয়ালা গাল নিয়ে রাস্তায় ছবি তুলছিলাম বলে এক উত্তরভারতীয় প্রৌঢ় আমার সামনে এসে জিজ্ঞেস করে ‘ফোটো কিঁউ খিঁচ রাহে হো ইধার? মুসলমান হো?’ আমি অবশ্যই সজোরে বলেছিলাম ‘ক্যানো! সে উত্তর আপনাকে দিতে হবে নাকি!’ কিন্তু ভেতরে ভেতরে কতটা যে সেদিন ভয় পেয়েছি, বোঝাতে পারবো না। তারপর যখন ভেবেছি আমি সত্যিই মুসলমান হলে কি হত; তখন সে ভয় আতঙ্কে পর্যবসিত হয়েছে। আর হ্যাঁ, এই ঘটনা যখনকার তখনও ভারত মোদিল্যান্ড হয়নি। 

ওরেস্তের প্রশ্নে বিব্রত ও ভয় উভয়েই বোধ করি। তারপর শেষে বলি, ‘এভাবে কোন ধর্মীয় সম্প্রদায় কেমন তা বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়, তবে এইটুকু বলতে পারি তারা আমার দেশে ভালো নেই। এমনকি মানুষের সাধারণ অধিকারও তাদের নেই। যেমন পৃথিবীর কোন দেশেই সংখ্যালঘুদের থাকেনা’। এরপর আশঙ্কা করতে করতে জানতে পারি ওরেস্তে নিজেই মুসলমান।
 

ওরেস্তের সাথে দু’দিনে অনেকদিনের বন্ধুত্ব হয়। সে ব্রাসেলসের পথে পথে আমার সাথে হাঁটে। বলে, এই দেশে প্রতিটা মানুষ একা। কারুর কোন বন্ধু নেই। তার একা লাগে। সে বিয়ে করতে চায়। সে বলে তার প্রেমিকা ছিলো বেলজিয়ান। কিন্তু এই ওয়েস্ট ইউরোপের মানুষ এত আধুনিক যে তারা সংসার পাততে চায় না, বাচ্চা চায় না, তারা চায় শুধু নিজের জীবন আনন্দে কাটাতে। সে আরও বলে যে সে বিয়ে করতে চায়। তার বর্তমান প্রেমিকা মরোক্কোর মেয়ে। মুসলমান। সে জানে সেই মেয়ে সংসারী হবেই। ওরেস্তে বলে বউ নিয়ে সে ভারতে আসতে চায়। তার তৃতীয় বিশ্ব ভালো লাগে।

তারপর সে আমায় নিয়ে যায় ব্রাসেলসের সিটি সেন্টারের পাশে এক গলিতে। সেই গলির রাস্তা রামধনুর রঙে মোড়া। ওরেস্তে বলতে থাকে ‘এখানে কারা থাকে জানো? গে’রা... এইসব প্রথম বিশ্বের নোংরামি। আমার বাড়িতে এর আগেও ভারতীয়রা থেকেছে। তাদের দেখিয়েছি। তারা বুঝেছে এই ব্যাভিচারের পরিনতি... এই জন্য আমার তৃতীয় বিশ্বের মানুষ ভালো লাগে...”

ব্রাসেলস থেকে ফেরার পর ওরেস্তে অনেকবার ফেসবুকে, হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করতে চেয়েছিলো। আমি পারিনি। আমি এখনও তার একাকীত্ব বুঝি। তার অন্য সমাজে মানিয়ে নেবার দ্বিধা, সমস্যাগুলো আমার অজ্ঞাত নয়। কিন্ত এসব বুঝেও, তার সাথে আমি যোগাযোগ কোনমতেই রাখতে পারিনা। 

image4