সাহিত্য পত্রিকা-ই বলা যেতে পারে...

অনিন্দ্য রায়

হাইকু এবং

  

“হাইকু কোনো কবিতা নয়, কোনো সাহিত্যও নয়; হাত দিয়ে দেখানো এক পথনির্দেশ, আধখোলা এক দরজা, পরিচ্ছন্ন আয়না একটি ... নীরব ভাষা এক, কারণ একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলেই অঙ্গুলিনির্দেশ করে, কেন-কোথায়-কীভাবে ব্যাখ্যা করে না কিছুই ।“ 

-R.H.Blyth 

( Haiku, vol:1, Eastern Culture, Tokyo: Hokuseido Press, 1949 ) 


পঙ্‌ক্তি তিন  

দু ছবি মুহূর্তের 

এক অবাক 


“এরকমটা আমাদের সবারই সঙ্গে হয়: সাধারণ একটা দিনের কাজকর্ম সারতে সারতে, আগে কয়েকশোবার করেছি এমন কোনো কাজ করতে করতে, একটা কিছু দেখে, অথবা তার ঘ্রাণে, অথবা স্পর্শে আমরা থমকে যাই। কী জানি কেন, মনে হয় যে আগে তো কখনও এমনটা হয়নি, অথচ সবসময় যেন এরকমটাই হওয়ার কথা। হতে পারে গভীর, ক্ষণিকও হতে পারে, যাইহোক, আমরা যেন বদলিয়ে যাই : এই অভিজ্ঞতা আর কখনোই হুবহু অনুভব করতে পারি না । যেন এই চলমান পৃথিবীর গভীরে দেখার মতো মুহূর্তের অন্তর্দৃষ্টি পেয়ে যাই।  

এই মুহূর্তগুলি কখনসখনও ব্যক্তিগত, এতটাই ভেতর থেকে উৎসারিত যে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। আবার কখনও এমনই প্ররোচক, এমনই চমকপ্রদ সেসব যে অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে ইচ্ছে হয়, প্রাণপণ চেষ্টা করি উপযুক্ত প্রকাশ করতে। এই চেষ্টাটাই আমাদের নিয়ে আসে কবিতার রাজ্যে, আর এই পরিস্থিতিতে প্রায়শই আমাদের কাজে আসে যে কাব্য-আঙ্গিক তা-ই হল হাইকু ।” ১ 


এইভাবে জিম ক্যাসিয়ান শুরু করেছেন তাঁর ‘How To Haiku ‘ বইটি; হাইকু হল মুহূর্তকাব্য, সেই মুহূর্ত যা আমাদের বিস্মিত করে, দ্রষ্টা করে আর তখন শব্দ যায় থেমে তাই এতো স্বল্প, সংযত ও সংহত, মাত্র তিনটি পর্ব, যথাক্রমে ৫-৭-৫ ধ্বনিমাত্রার, এতোই হ্রস্ব, অথচ বিস্তৃত – এক বিস্ময়ভাষ্য, হাইকু নিজেই এক বিস্ময় । 

হাইকু শব্দটিকে ভেঙে দেখলে আমরা পাই, ‘হাই’ মানে খেলা করা আর ‘কু’ মানে শব্দ/কথা,।২ মুজিব মেহেদি হাইকুকে বলেছেন ‘ক্রীড়মান পদ্য’৩। 


(কলা রমেশ ‘কু’-এর অর্থ বলেছেন ‘কাব্য’ আর কিয়োতোর বুক্‌ক্য বিশ্ববিদ্যলয়ের অধ্যাপক সুবৌচি নেনতেন-এর মতে ‘হাই’-এর অর্থ, আক্ষরিকভাবেই, ‘না-মানবিক’।৪) 

জাপানে এর প্রবর্তন এবং জাপানি ভাষা ও সংস্কৃতিতে হাইকু উজ্জ্বল হয়ে আছে। 

জাপানের দেশজ সাহিত্যের আদি নিদর্শন পাওয়া যায় গানে, কোজিকি ও নিহনগি নামের প্রাচীন কাহিনীতে, এবং নোরিতোয় বা জাপানের দেশজ ধর্ম শিন্‌তো-র স্তোত্রমালায়।কোজিকি ও নিহনগির বেশিরভাগ কবিতাই যষ্ঠ-সপ্তম শতাব্দীতে রচিত। নহিতো, যদিও গদ্য, তবু তার মধ্যে কাব্যিক উপাদান ছিল উল্লেখযোগ্য; এগুলির রচনাকাল নিয়ে যদিও বিতর্ক আছে, তবু মনে করা হয় সপ্তম শতাব্দীতে এই ধর্মীয় আচারের সাহিত্য বিশেষ রূপ পায়।৫  


হাইকু শব্দটি এসেছে হা্ইকাই রেঙ্গা নো হোক্কু ( হালকা সম্মিলিত কবিতার সূচনা পঙ্‌ক্তিগুলি) থেকে । ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত এই আঙ্গিকের হাইকু নাম ছিল না, মাসাউকা শিকি (১৮৬৭-১৯০২) এই নাম দেন । হাইকু হল পরম্পরাগত ৫-৭-৫-৭-৭ ধ্বনিমাত্রার পাঁচ পঙ্‌ক্তির ওয়াকা(তন্‌কা বা উতা নামেও পরিচিত)-র প্রথম অংশ। তন্‌কা আর উতা আমরা পাই অষ্টম শতকের কাব্যসঞ্চয়ন মানিওশু -তে, শিনঅনকিনশ্যু (একটি কবিতা সংকলন, দ্বাদশ শতাব্দীর শুরুতে প্রকাশিত)-র সময় থেকে ওয়াকা-র গুরুত্ব কমতে থাকে আর রেঙ্গা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। রেঙ্গা, বা সম্মিলিত কাব্য, হল এক ধরণের কবিতা সংলাপ, ওয়াকা-র উত্তরাধিকারী, যেখানে ৫-৭-৫ ধ্বনিমাত্রার প্রথম তিনটি পঙ্‌ক্তি লেখেন একজন আর পরবর্তী ৭-৭ মাত্রার দুটি পঙ্‌ক্তি আরেকজন, পরের ৫-৭-৫ মাত্রার তিন পঙ্‌ক্তি আবার তৃতীয় কেউ, এইভাবে চলতে থাকে। এইবাবে চার পাঁচজন মিলে ১০০ বা তার বেশি কবিতার রেঙ্গা রচনা করেন। এই দীর্ঘ যৌথ কবিতার প্রথম তিন পঙ্‌ক্তিকে বলা হয় হোক্‌কু, যা গুরুত্বে আর মানে সেরা। ফুজিয়ারা সাদাই ( ১১৬২ – ১২৪১) ও ফুজিয়ারা সাদাতাকে( ১১৩৯?-১২০২)-র ১১৮৬-তে ঘোষিত নিয়ম মেনেই লেখা হত রেঙ্গা। লিও সাওগি ( ১৪২১-১৫০২)-কে বলা হয় তাঁর মার্জিত ও শৈল্পিক রেঙ্গা দিয়ে হাইকু-কে সাহিত্যের স্তরে নিয়ে যাওয়া কবি। তিনি, ইয়ামাজাকি সোকান(১৪৬৫-১৫৫৩), নিশিয়ামা সোইন(১৬০৫-১৬৮২) ও অন্যান্যরা প্রচলিত বিধিবদ্ধ ওয়াকা-র বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন । যেকোনো শব্দভাণ্ডার থেকে শব্দ ব্যবহার আর কবিতায় কৌতুকরসবোধ শুরু করেন তাঁরা। এই মাটির কাছাকাছি সম্মিলিত কবিতা-ঘরানার নাম হয় রেনকু যদিও প্রথম তিন পঙ্‌ক্তিকে হোক্‌কু-ই বলা হত। এই নতুন হোক্‌কু-কে হাইকাই রেঙ্গা বলা শুরু হয়, ক্রমে হাইকাই শব্দেই হোক্‌কু-কে বোঝানো প্রচলিত হয় । বলা যায়, শিকি-র আগে হাইকু হোক্‌কু  নামে পরিচিত ছিল । হোক্‌কু পৃথিবীর হ্রস্বতম কবিতাগুলির মধ্যে অন্যতম, তাই আঙ্গিক ও ভাবের শৈল্পিক মেলবন্ধনের কঠোর প্রয়াস প্রয়োজনীয় । মাৎসুয়ো বাশো  (১৬৪৪-১৬৯৪) হাসি-মস্করার পদ্যচর্চা থেকে একে বাস্তবের সঙ্গে অর্থময় প্রতিক্রিয়ায় প্রকৃত সাহিত্যের মানে নিয়ে আসেন। বাশোর হাইকাই-এর শৈলীকে শোফু বলা হোয়, তাঁর নামের দ্বিতীয় অর্ধ থেকে শো আর ফু-এর অর্থ শৈলী/স্টাইল। প্রকৃতিই কবিতায় উৎকর্যের নিদর্শন এই হল শোফু মতাদর্শের মূল। অনেকেই এই কবিতাধারায় উদ্ধুব্ধ হন, তাকারাই কিকাকু (১৬৬১-১৭০৭) বাশোর শিষ্যদের মধ্যে অন্যতম। ১৬৯১-তে প্রকাশিত সঞ্চয়ন ’সারুমিনো’ বাশো-শৈলীর মহাগ্রন্থ। বাশোর মৃত্যুর পর হাইকাই চর্চা সাময়িক ব্যাহত হলেও আগেইয়োসা বুসোন(১৭১৬-১৭৮৩), কোবায়িশি ইসসা(১৭৬৩-১৮২৭), মাসাউকা শিকি একে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন। হাইকু নামকরণটি করেন শিকি, নানা ধরণের বিষয় আর নৈব্যক্তিকতা বাড়িয়ে এই আঙ্গিককে নতুন চরিত্র দেন তিনি।৬  


কাকে বলব হাইকু ? ৫-৭-৫-এ লেখা যেকোনো তিন লাইনের কবিতাকে? না, হাইকু হয়ে ওঠার আরও কিছু নিয়ম আছে। 


হাইকু হল তিন লাইনের কবিতা, আমরা জানি। ধ্রুপদী জাপানি হাইকু লেখা হত একটি উল্লম্ব লাইনে (জাপানি হাইকুর সমসাময়িক প্রকাশনায় এখনও এই বিন্যাস ব্যবহার করা হয়) ১৭ অন-এ ( অন হল ধ্বনিগত একক, যেমন গা, অ্যা, সু বা নো, যেগুলি যুক্ত হয়ে জাপানি ভাষায় শব্দ তৈরি করে)। পঙ্‌ক্তি বিভাজন যদিও প্রকট ছিল না, তা বোঝা যেত অন্তর্বিবেচনায় ( এবং জাপানি ভাষার উচ্চারণগত যতি দিয়ে)। বেশির ভাগ কবিতাই তিনটি অংশে বিভক্ত, প্রথমটি ৫, দ্বিতীয়টি ৭ ও তৃতীয়টি ৫ অন-এ রচিত, সাথে প্রথম অথবা দ্বিতীয় “লাইন’-এর পর ব্যাকরণগত বিরতি। ( কম ক্ষেত্রে দ্বিতীয় “লাইন”-এর মাঝে)। ৫-১২ বা ১২-৫ অন-এর বিষম বর্গের এই ত্রিধা বিন্যাসই জাপানি হাইকুর আদর্শ প্রকরণ, ইংরেজিতে সমীভূত করতে গিয়ে এই আঙ্গিক বজায় রাখতে নানান প্রচেষ্টা করা হয়েছে । অনেক সময় জাপানি ও ইংরেজির অমিল ভরাট করতে ছাড় দেওয়াও হয়েছে । 


একটি ফাঁদ 

শালুকপাতে টানা - 

ভাদ্র বিকেল

 বারনেল লিপ্পি 


তিন লাইনের ছোট-বড়ো-ছোটর বিন্যাসকেই আমরা ইংরেজিতে স্ট্যান্ডার্ড ধরতে পারি ’৭ 

এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই তিনলাইনের রীতিটিই সারা পৃথিবীতে গৃহীত, জাপানেও। 

আমরা জানি, হাইকু মুহূর্তকাব্য। আমাদের সামনে যে চরাচর তার কোনো এক ঘটনা আমাদের চেতনায় ‘অঘটন’ ঘটায়,কেনেথ ইয়াসুদা-র কথায়, “ যখন কেউ, ধরা যাক, মনোরম সূর্যাস্ত বা অপরূপ ফুল দেখে, প্রায়শই এতো খুশি হয় যে স্তম্ভিত হয়ে যায়। মনের এই অবস্থাকে বলা যেতে পারে “আহ্‌-ত্ব” দর্শকের একটি শ্বাসদীর্ঘ খুশির বিস্ময়উচ্চারণ “আহ্‌!” ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। এতে সে অধিগ্রস্ত হয়ে পড়ে আর সে সেটির আকার, রং, ছায়া, মিলমিশ বুঝে নিতে পারে। মুহূর্তের জন্য একটা প্যাটার্ন, একটা বিশেষত্ব তার চোখে পড়ে যা আগে সে দেখেনি ।” ৮ 

সে লগন প্রতীতির। “হাইকু-মুহূর্তের সংজ্ঞা এভাবে দেওয়া যায় যে, একটি ক্ষণ যখন মানুষ বস্তুর সঙ্গে একাত্ম হয়, বস্তুই হয়ে যায় কার্যত, সত্তার চিরায়ত, বিশ্বজনীন সত্য উপলব্ধি করতে পারে ।”৯ 

এই মুহূর্তের ভাষাচিত্র ধরে রাখেন হাইজিন ( হাইকু রচিয়িতা), সে ছবি প্রকৃতির । প্রকৃতিই হাইকুর ভারকেন্দ্র। আর প্রকৃতি অনিত্য, বদলায়, শীত থেকে বসন্তে, বসন্ত থেকে গ্রীষ্মে … বরফ পড়ে, ফুল ফোটে। ঋতুর এই পরিবর্তন আমাদের চারপাশের জগৎ-সংসার পাল্টে দেয়, প্রভাব ফেলে মনে। ঋতু আর প্রকৃতির কবিতা হাইকুতে ঋতুগত উপাদান ব্যবহার করা হয় প্রচুর পরিমাণে। ( যদিও হাইকু প্রায় যেকোনো কিছু নিয়েই লিখতে পারেন কেউ আর ঋতুর উল্লেখ বাদ দিতেও পারেন।১০ ) ঋতুগত শব্দ বা বাক্যাংশকে বলা হয় কিগো এবং পরম্পরাগত হাইকুতে কিগো-র প্রয়োগ বাধ্যতামূলক। জাপানে চারটি ঋতু - বসন্ত( হারু), গ্রীষ্ম (নাৎসু), শরৎ (আকি) ও শীত(ফুয়ু); এদের প্রত্যেককে আবার প্রারম্ভিক, মধ্য ও অন্তিম এই তিনভাগে ভাগ করা হয়। এছাড়া নববর্ষকে ধরা হয় একটি বিশেষ সময়কাল হিসেবে । এই সমস্ত কালসমন্ধীয় শব্দই কিগো। সাইজিকি হচ্ছে অভিধানের মতো কিগোর সংগ্রহ যাতে ঋতু-সম্পর্কিত শব্দগুলি 

ঋতু

আকাশ ও স্বর্গ

পৃথিবী

মানবপ্রকৃতি 

পর্যবেক্ষণ 

জীবজন্তু

উদ্ভিদ

এইসব শ্রেণীবিভাগে সাজানো থাকে । 


শীতের ‘আকাশ ও স্বর্গ’ বিভাগের কিগো সুমোগ্‌গু ( ধোঁয়াশা), পৃথিবী বিভাগের ইয়ুকিমি (তুষার দেখা), উদ্ভিদ বিভাগের অচিবা (ঝরাপাতা)।  

কাওয়াজু (ব্যাং) হল বসন্তের ‘জীবজন্তু’ শ্রেণীর, হাসু (পদ্মফুল) গ্রীষ্মের ‘উদ্ভিদ’ শ্রেণীর। কিগো জাপানি বা অ-জাপানি হতে পারে। জাপানে কোনো শিক্ষার্থী হাইকু রচনা শেখার জন্য গুরুর কাছে গেলে প্রথমে তাকে সাইজিকি পড়তে দেওয়া হয়, এটা ভালোভাবে বোঝার জন্য যে, ঋতু পরিবর্তন কীভাবে আমাদের মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে আর মানসিক অবস্থা কীভাবে চারপাশে প্রতিফলিত হয়। 

হাইকুর আরেকটি আবশ্যিক জিনিস কিরেজি বা ছেদ-শব্দ, যা বিরতি বা সমাপ্তি বুঝিয়ে কবিতাটিকে ‘ছিন্ন’ করে।জাপানিতে দুটি প্রধান ছেদ শব্দ হছে য়া আর কানা । য়া বিরতি সূচিত করে, “হাইকুকে দুটি ভাগে বিভক্ত করে আর পরে সাধারণত থাকে বর্ণনা বা তুলনা, কখনো বা মনে জেগে-ওঠা অনুভূতির চিত্রণ। সবসময়ই একটা সমীকরণের আভাস থাকে তাই ইয়া-র অভিঘাত সবচেয়ে ভালো প্রকাশ করা যায় কোলন দিয়ে”১১।  কানা হাইকুর সমাপ্তি নির্দেশিত করে, “এক অনির্বচনীয় আবেগের উচ্ছাস রয়েছে এতে, কখনো কোমল এক দীর্ঘশ্বাস”১২অথবা “আহ্‌!”, একটি বিস্ময়চিহ্নের চেয়ে অধিক কিছু।  

প্রথাগত জাপানি হাইকু-তে যতিচিহ্ন ব্যবহার হত না, কিরেজি দিয়েই বিরাম বোঝানোর কাজটা করা হত । অন্যভাষায় এটা সম্ভব হয় না । পাশ্চাত্যের যতিচিহ্নের যদিও হাইকু অনুবাদে বা অন্যভাষার হাইকুতে ব্যবহৃত হচ্ছে, যতিচিহ্ন দিয়ে কিরেজিকে প্রতিস্থাপিত করা হচ্ছে, কোলন (: ), সেমিকোলন (;) বা ড্যাশ (-)-এর মধ্যে সংযোগকারী চিহ্ন,বিস্ময়চিহ্ন(!) বা পুর্ণচ্ছেদ ( . বা ।) হাইকুতে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে।১৩ 

মাকুরা-কাতোবা ( বালিশ-শব্দ) কাকে-কাতোবা ( পিভট-শব্দ) হাইকুর আরো দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োগশৈলী। 

কিরেজি দিয়ে তৈরি করা এই কেটে-জুড়ে নেওয়ার টেকনিককে বলে কিরে, আর এ হল হাইকুর অন্যতম শর্ত। দুটি ছবিকে পাশাপাশি রেখে তাদের মিথস্ক্রিয়ায়, জাক্সটাপজিশনে কাব্যিক ব্যঞ্জনা ফুটে ওঠে । 

বাশোর একটি জনপ্রিয় কবিতার উদাহরণ আমরা দেখে নিতে পারি, 


ফুরু ইকে য়া

কাওয়াজু তবিকোমু

মিজু নো ওতো 


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুবাদে 


পুরোনো পুকুর,

 ব্যাঙের লাফ,

 জলের শব্দ। 


প্রথম পর্বের শেষে ‘য়া’ শব্দটি এখানে কিরেজির কাজ করছে, যা পুরোনো পুকুরের স্থবিরতার সাথে ব্যাঙের লাফের চলমানতাকে পৃথক করছে। 

মানুষের কোনো ক্রিয়াকলাপের বিবরণ থাকে না হাইকুতে। দ্রষ্টা আর দৃশ্যের একাত্মতার দর্শনে তার বিশ্বাস, জেন তার মতাদর্শের ভিত্তি। যদিও সব হাইকু রচয়িতাই জেন সাধক নন, তবুও এই কাব্যধারায় গুরুত্বপূর্ণ অনেকেই ছিলেন জেন মতে বিশ্বাসী। বাশো ছিলেন জেন-দীক্ষিত বৌদ্ধসন্ন্যাসী। বুসান, ইসসা ও শিকি ছিলেন জেন আলোকপ্রাপ্ত । মহাযান বৌদ্ধধর্ম, তাও-বাদ ও কুনফুসিয়াসবাদের কয়েক-শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য থেকেই জেন-বাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। 

“’জেন’ ধর্মের উদ্ভব চিন দেশে হলেও ‘জেন’ শব্দটি আদতে জাপানি ।

শব্দটি আবার এসেছে সংস্কৃত ‘ধ্যান’ থেকে । অবশ্য ‘ধ্যান’ থেকে আসা মূল চিনা শব্দটি হল ‘চান’। এই ‘চান’ই যখন চিন থেকে জাপানে প্রচারিত ও প্রসারিত হল তার নাম হয়ে গেল ‘জেন’ । 

... মূল তত্ত্বের গভীরে না গিয়েও যে কথাটা নিশ্চিত ভাবে বলা যায় তা হল নিজের সত্তাকে অনুভব করার জন্যে সহজিয়া সিদ্ধযোগীদের মতো জেনবাদীরাও একটা বিষয়ের ওপর বিশেষ জোর দেন এবং তা হল মেডিটেশন বা ধ্যান। অধিকাংশ জেন-মন্দির বা শিক্ষাকেন্দ্রে অবশ্যকরণীয় নিত্য কর্ম-পদ্ধতির তালিকায় প্রথম কাজটিই হল নিয়মিত ধ্যানের অভ্যাস । 

... ধ্যানের সঙ্গে আরেকটা জিনিসের অভ্যাস করাটা একজন জেন-সাধকের কাছে এক রকম বাধ্যতামূলকই বলা যায়, তার নাম ‘কোয়ান’ । গুরু শিষ্যের সামনে একটা প্রশ্ন রাখেন যার নির্দিষ্ট কোনো মানে বা উত্তর হয় না আবার তার অনেক অনেক মানে বা উত্তর হতে পারে । একটা চরম ধাঁধাঁ । 

... তবে জেন বা কোয়ানের জগতের এইসব ঘটনাগুলিকে আপাত-দৃষ্টিতে যতই তুচ্ছ যতই অর্থহীন বা যতই খামখেয়ালিপনা, ছেলেমানুষি, হযবরল অথবা হিং-টিং-ছট বলে মনে হোক না কেন এগুলি মোটেই কোনো হাসি-ঠাট্টা, ইয়ার্কি-ফাজলামো বা প্রহসনের ব্যাপার নয়। 

কারণ এসবের ভিতর দিয়েই একজন জেনসাধকের সত্যদর্শন হয় । তিনি তাঁর বহু আকাঙ্ক্ষিত বোধিসত্তাবস্থা লাভ করেন । জেন পরিভাষায় যাকে বলা হয় সতোরি ।”১৪  

“জেন-এর সতোরি কেনেথ ইয়াসুদা কথিত হাইকু মুহূর্তের অনুরূপ । সতোরি যেমন জেন-এর হৃদয়, তার পূর্ণ লক্ষ্য, তেমনি হাইকু মুহূর্ত হল হাইকুর হৃদয় আর এর উৎস।”১৫ 

জেন-এর শূন্যতা, একত্ব, অনিত্যতা, তথতা-জ্ঞান এরকম নানান ধারণা আমরা হাইকুর ভিতরে পাই। 

এবং হাইকু নিরলঙ্কার, উপমা, রূপক, অন্ত্যমিল, বিশেষণের আধিক্য থাকে না পরম্পরাগত হাইকুতে। থাকে না মানবিক বা সামাজিক ক্রিয়াকলাপ; হাইকু শিরোনামহীন, থাকে না যতিচিহ্ন, কোনো ব্যক্তিগত সর্বনামও ব্যবহার নেই, নেই ‘আমি’, ব্যক্তি-কবি অনুপস্থিত থাকেন । “একটি বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে একাধিক ছবি শব্দবন্দি করে হাইকুকবি নির্দিষ্ট প্রাকৃতিক বিস্ময় ও সত্যকে ভাষারূপ দেন । প্রশ্ন উঠবে যে, তাহলে কি হাইকুকবির মানস হাইকুতে অনুপস্থিত থাকে ? না, বাক্য ও বাক্যাংশের বিন্যাসের মধ্যে একজন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তাঁর বিবেচনা অবসম্ভাবীরূপে ছাপ ফেলে, ওই একবারই তিনি উপস্থিত; তার পরে আগাগোড়াতেই তিনি অনুপস্থিত। তবে হতে পারে যে, কবির এ অনুপস্থিতি, হাইকুতে, উপস্থিতিরও অধিক।”১৬  

হাইকুর সঙ্গে গদ্যাংশ সংযুক্ত করে হয় হাইবুন, অনেকসময়ই যা ভ্রমণবৃত্তান্ত, ডায়েরি, গদ্যকবিতা, ছোট গল্প, নিবন্ধ বা আত্মজীবনীমূলক। বাশো ১৬৯০-এ তাঁর শিষ্য ক্যোরাই-কে লেখা একটি চিঠিতে তিনি এই শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন, তাঁর ওকু নো হোসমিচি ( গভীর উত্তরের সরু পথ) জনপ্রিয় হাইবুন সংকলন। বুসোন, ইসসা, শিকি প্রায় সব প্রধান হাইকু কবিই এই ধারায় লিখেছেন।

হাইজা হল হাইকুর নন্দনতত্ত্ব নির্ভর জাপানি পেনটিং যা থাকে হাইকুর সাথেই। নোনোগুচি রিউহো-কে এই শৈলী সৃষ্টির কৃতিত্ব দেওয়া হয় । বাশোও আঁকতেন তাঁর লেখার সঙ্গে।

জনপ্রিয় হাইকু পাথরে খোদাই করে বানানো স্মারককে বলে কুহি । দুশোর বেশি কুহি আছে মাৎসুয়ামা শহরে ।  

৫-৭-৫-এর আরেকটি জাপানি কবিতার ফর্ম সেনরু বলা যেতে পারে ‘মানবিক’ হাইকু, যেখানে থাকে মানুষের কথা, সমাজের কথা। কারাই হাচিমন ( ১৭১৮-১৭৯০, ছদ্মনাম সেনরু, কারাই সেনরু নামেও পরিচিত ) আরও অনেকের সঙ্গে এই হাস্যরস আর বিদ্রুপাত্মক ছোট কবিতাগুলির সংকলন প্রকাশ করেন যা সে সময়ে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।১৭ অষ্টাদশ শতাব্দীতে সেনরু ও অন্য সম্পাদকেরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, ধ্রুপদী হাইকু আর পাঠকের মন ভোলাতে পারছে না, মানবিক ব্যাপারস্যাপার নিয়ে একটু মজার কবিতা হিসেবে সেনরু পাঠকের কাছে সমাদৃত হয়। হাইকুর মতো বিষয় ও উপস্থনা নিয়ে নিয়মের নিগড় নেই এতে, ছন্দকাঠামো মেনে অনেকটা উন্মুক্ত মনে এই ধারায় পৃথিবীর নানা ভাষার কবিরা লিখে চলেছেন। কারাই সেনরু-র সংকলন থেকে 


ডাকাত ভেবে

ধরে দেখি আমার

নিজের ছেলে 

( অনুবাদ ঃ মুজিব মেহদী ) 


 হাইকু ও তার সম্পর্কিত শব্দগুলিকে নানাজন ব্যাখ্যা করেছেন নানাভাবে, আমেরিকান হাইকু সোসাইটির দেওয়া সংজ্ঞা থেকে আমরা একটু দেখে নিই

  (Official Definition of Haiku and Related Terms, www.hsa.org

 হাইকু হল হ্রস্ব কবিতা যা মানবপরিবেশের সাথে স্বজ্ঞায় সংযুক্ত প্রকৃতি বা ঋতুর অভিজ্ঞতার নির্যাস প্রকাশ করতে চিত্ররূপময় ভাষা ব্যবহার করে।

পুরোনো সংজ্ঞাটি ছিলঃ (১৯৭৩/১৯৭৬) 

অন্ত্যমিলহীন জাপানি কবিতা যা গভীরভাবে উপলব্ধি করা মুহূর্তের নির্যাসকে লিপিবদ্ধ করে, মানব চরিত্রের সঙ্গে প্রকৃতিকে সংযুক্ত করে। 

সাধারণত এতে থাকে সতেরো অঞ্জি ( জাপানি ধ্বনি মাত্রা ) । 

সেনরুহল গঠনগতভাবে হাইকুর অনুরূপ কবিতা যা মানবচরিত্রের অসংগতিগুলো হাস্যরসাত্মক বা বিদ্রুপাত্মকভাবে তুলে ধরে। 

হাইকাই হল যোড়শ শতাব্দীতে পূর্বতন অভিজাত রেঙ্গা-র বিপরীতে সৃষ্ট জনপ্রিয় জাপানি যৌথকবিতা হাইকাই নো রেঙ্গা-র সংক্ষিপ্তরূপ। জাপানি ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই সমস্ত হাইকুবিষয়ক সাহিত্য ( হাইকু, রেনকু, সেনরু, হাইবুন, হাইকুকবিদের দিনলিপি ও ভ্রমণলেখা) বোঝাতে হাইকাই শব্দটি ব্যবহৃত হয়। 

 হাইবুন হল বাহুল্যবর্জিত, তুলনামূলকভাবে ছোট হাইকাই শৈলীর গদ্যকবিতা যাতে লঘু হাস্যরসাত্মক বা গভীরতর উপাদান দুইই থাকে। হাইবুন সাধারণত একটি হাইকু দিয়ে শেষ হয় । 

আমাদের সাথে হাইকু-র পরিচয় করিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে তাঁর জাপান ভ্রমণকালে এই তিন লাইনের জাপানি কবিতার প্রতি তিনি আকৃষ্ট হন।

“একটা জিনিস এখানে পথে ঘাটে চোখে পড়ে। রাস্তায় লোকের ভিড় আছে, কিন্তু গোলমাল একেবারে  নেই। এরা যেন চেঁচাতে জানে না, লোকে বলে জাপানের ছেলেরা সুদ্ধ কাঁদে না। আমি এ’পর্যন্ত একটি ছেলেকেও কাঁদতে দেখি নি। পথে মোটরে করে যাবার সময়ে মাঝে মাঝে যেখানে ঠেলাগাড়ি প্রভৃতি বাধা এসে পড়ে, সেখানে মোটরের চালক শান্তভাবে অপেক্ষা করে; গাল দেয় না, হাঁকাহাঁকি করে না। পথের মধ্যে হঠাৎ একটা বাইসিক্‌ল্‌ মোটরের উপরে এসে পড়বার উপক্রম করলে, আমাদের দেশের চালক এ অবস্থায় বাইসিক্‌ল্‌-আরোহীকে অনাবশ্যক গাল না দিয়ে থাকতে পারত না। এ লোকটা ভ্রূক্ষে পমাত্র করলে না। এখানকার বাঙালিদের কাছে শুনতে পেলুম যে, রাস্তায় দুই বাইসিক্‌লে, কিম্বা গাড়ির সঙ্গে বাইসিক্‌লের ঠোকাঠুকি হয়ে যখন রক্তপাত হয়ে যায়, তখনো উভয় পক্ষ চেঁচামেচি গালমন্দ না করে গায়ের ধুলো ঝেড়ে চলে যায়।

আমার কাছে মনে হয়, এইটেই জাপানের শক্তির মূল কারণ। জাপানি বাজে চেঁচামেচি ঝগড়াঝাঁটি করে নিজের বলক্ষয় করে না। প্রাণশক্তির বাজে খরচ নেই ব’লে প্রয়োজনের সময় টানাটানি পড়ে না। শরীর-মনের এই শান্তি ও সহিষ্ণুতা ওদের স্বজাতীয় সাধনার একটা অঙ্গ। শোকে দুঃখে আঘাতে উত্তেজনায়, ওরা নিজেকে সংযত করতে জানে। সেইজন্যেই বিদেশের লোকেরা প্রায় বলে, জাপানিকে বোঝা যায় না, ওরা অত্যন্ত বেশি গূঢ়। এর কারণই হচ্ছে, এরা নিজেকে সর্বদা ফুটো দিয়ে ফাঁক দিয়ে গ’লে পড়তে দেয় না।

এই যে নিজের প্রকাশকে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত করতে থাকা, এ ওদের কবিতাতেও দেখা যায়। তিন লাইনের কাব্য জগতের আর কোথাও নেই। এই তিন লাইনই ওদের কবি, পাঠক, উভয়ের পক্ষেই যথেষ্ট। সেইজন্যেই এখানে এসে অবধি, রাস্তায় কেউ গান গাচ্ছে, এ আমি শুনি নি। এদের হৃদয় ঝরনার জলের মতো শব্দ করে না, সরোবরের জলের মতো স্তব্ধ। এপর্যন্ত ওদের যত কবিতা শুনেছি সবগুলিই হচ্ছে ছবি দেখার কবিতা, গান গাওয়ার কবিতা নয়। হৃদয়ের দাহ এবং ক্ষোভ প্রাণকে খরচ করে, এদের সেই খরচ কম। এদের অন্তরের সমস্ত প্রকাশ সৌন্দর্যবোধে। সৌন্দর্যবোধ জিনিসটা স্বার্থনিরপেক্ষ। ফুল, পাখি, চাঁদ, এদের নিয়ে আমাদের কাঁদাকাটা নেই। এদের সঙ্গে আমাদের নিছক সৌন্দর্যভোগের সম্বন্ধ–এরা আমাদের কোথাও মারে না, কিছু কাড়ে না, এদের দ্বারা আমাদের জীবনে কোথাও ক্ষয় ঘটে না। সেইজন্যেই তিন লাইনেই এদের কুলোয়, এবং কল্পনাটাতেও এরা শান্তির ব্যাঘাত করে না।

এদের দুটো বিখ্যাত পুরোনো কবিতার নমুনা দেখলে আমার কথাটা স্পষ্ট হবে:


পুরোনো পুকুর,

ব্যাঙের লাফ,

জলের শব্দ।


বাস আর দরকার নেই। জাপানি পাঠকের মনটা চোখে ভরা। পুরোনো পুকুর মানুষের পরিত্যক্ত, নিস্তব্ধ, অন্ধকার। তার মধ্যে একটা ব্যাঙ লাফিয়ে পড়তেই শব্দ শোনা গেল। শোনা গেল–এতে বোঝা যাবে পুকুরটা কী রকম স্তব্ধ। এই পুরোনো পুকুরের ছবিটা কী ভাবে মনের মধ্যে এঁকে নিতে হবে সেইটুকু কেবল কবি ইশারা করে দিলে; তার বেশি একেবারে অনাবশ্যক।

আর-একটা কবিতা:

পচা ডাল,

 একটা কাক,

   শরৎকাল।

আর বেশি না! শরৎকালের গাছের ডালে পাতা নেই, দুই-একটা ডাল পচে গেছে, তার উপরে কাক ব’সে। শীতের দেশে শরৎকালটা হচ্ছে গাছের পাতা ঝরে যাবার, ফুল পড়ে যাবার, কুয়াশায় আকাশ ম্লান হবার কাল–এই কালটা মৃত্যুর ভাব মনে আনে। পচা ডালে কালো কাক বসে আছে, এইটুকুতেই পাঠক শরৎকালের সমস্ত রিক্ততা ও ম্লানতার ছবি মনের সামনে দেখতে পায়। কবি কেবল সূত্রপাত করে দিয়েই সরে দাঁড়ায়। তাকে যে অত অল্পের মধ্যে সরে যেতে হয় তার কারণ এই যে, জাপানি পাঠকের চেহারা দেখার মানসিক শক্তিটা প্রবল।

... 

যাই হোক, এই কবিতাগুলির মধ্যে কেবল যে বাক্‌সংযম তা নয়, এর মধ্যে ভাবের সংযম। এই ভাবের সংযমকে হৃদয়ের চাঞ্চল্য কোথাও ক্ষুব্ধ করছে না। আমাদের মনে হয়, এইটেতে জাপানের একটা গভীর পরিচয় আছে। এক কথায় বলতে গেলে, একে বলা যেতে পারে হৃদয়ের মিতব্যয়িতা ।”

ঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 

জাপান যাত্রী

 (প্রথম প্রকাশঃ১৯১৯, ইন্ডিয়ান পাবলিশিং হাউস) 

রবীন্দ্রনাথ যে দুটি হাইকুর অনুবাদ করেছিলেন সেগুলির রচয়িতা বাশো, যদিও কবিগুরু সে দুটিকে হাইকু না বলে‘তিন লাইনের কাব্য’ বলেছেন। হাইকু লেখেননি বিশ্বকবি, কিন্তু হ্রস্ব কবিতার প্রতি আগ্রহী হয়েছেন। ১৯২৬-এ প্রকাশিত হয় তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘লেখন’, ‘স্ফুলিঙ্গ’ ১৯৪৫-এ, দুটিই কম দৈর্ঘ্যের কবিতার সংকলন।  ‘লেখন’-এর ভূমিকায় কবি লেখেন, “এই লেখনগুলি সুরু হয়েছিল চীনে জাপানে । পাখায় কাগজে রুমালে কিছু লিখে দেবার জন্য লোকের অনুরোধে এর উৎপত্তি ।” তাঁর হস্তাক্ষরে মুদ্রিত কবিতাগুলি বাংলা-ইংরেজি দ্বিভাষিক। “লেখনের সগোত্র আরও বহু কবিতা রবীন্দ্রনাথের নানা পাণ্ডুলিপিতে, বিভিন্ন পত্রিকায়, ও তাঁহার স্নেহভাজন বা আশীর্বাদপ্রার্থীদের সংগ্রহে এতদিন বিক্ষিপ্ত ছিল । ... এই কবিতাসমষ্টি হইতে সংকলন করিয়া স্ফুলিঙ্গ প্রকাশিত হইল।” পাই “স্ফুলিঙ্গ’’ সম্পর্কিত কথায়। বইদু'টিতে অন্যান্য লাইনসংখ্যার কবিতার সাথে তিন লাইনের কবিতাও আছে, হাইকুর প্রভাবও হয়তো খুঁজে পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু ‘হাইকু’ নেই, কবির সে দাবিও নেই। 

“অবশ্য কোনো কোনো লেখাকে মুক্তক হাইকু ভাবতে আপত্তি জাগে না মনে; যেমন ৭৩ সংখ্যক(‘লেখন’-এর) কবিতাটি: 


ফুলগুলি যেন কথা

 পাতাগুলি যেন চারিদিকে তার

 পুঞ্জিত নীরবতা ।। 

...

( স্ফুলিঙ্গ) গ্রন্থটির ১৩৭ সংখ্যক ভুক্তিকে ৭-৯-৭ চালের মুক্তক হাইকু ভাবতে মন চায়, যাতে এমনকি আবশ্যিক ঋতুচিহ্ন (কিগো)ও উপস্থিত। 


পুষ্পের মুকুল 

নিয়ে আসে অরণ্যের 

আশ্বাস বিপুল ।।”১৮ 


যদিও এগুলিকে ‘বিশুদ্ধ হাইকু’ বলা যায় না । বাংলা ভাষায় কি আদৌ হাইকু লেখা সম্ভব, জাপানি ছাড়া আর অন্য কোনো ভাষাতেই কি লেখা যেতে পারে প্রকৃত হাইকু ?

বীতশোক ভট্টাচার্য-র মতে “জাপানি ছাড়া অন্য কোনো ভাষায়, জেন ছাড়া অন্য কোনো ছাড়া,প্রকৃত হাইকু লেখা সম্ভব নয় বোধহয় ।”১৯ 

তবু পৃথিবীর নানা ভাষায় হাইকু চর্চা আজ জনপ্রিয়; কবিরা নিজের নিজের ভাষার মৌলিক চরিত্র ও হাইকুর নিয়মনীতি ব্যবহার করে ভাষাটির উপযোগী হাইকু প্রকরণ বানিয়ে নিয়েছেন্টা করেছেন মূল হাইকু আঙ্গিকের যথাসম্ভব কাছাকাছি থাকতে, হাইকুর উপাদান থেকে কেউ আবার তৈরি করেছেন নতুন কবিতাশৈলী। 

রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক তামিল ‘মহাকবি ভারতী’ বলা হয় যাঁকে সেই সুব্রমন্য ভারতী ১৯১৬ সালে জাপানি কবিতা নিয়ে একটি নিবন্ধে হাইকু সম্পর্কে লেখেন এবং কয়েকটি হাইকু তামিলে অনুবাদ করেন। ১৯২৫-এ তামিল কবি কে এস ভেঙ্কটরমানি-র ‘কাগজের নৌকো’ নামে কবিতার বইটিতে প্রকাশিত হয় 

কোনায় ছেঁড়া 

কাগজের নৌকোটি 

ভাসি আবার 

   এই কবিতাটি । 

সম্ভবত তামিলে লেখা প্রথম হাইকু।২০ আমাদের দেশে লেখা প্রথম মৌলিক হাইকুও কি এটিই ? গুজরাতিতে হাইকু জনপ্রিয় করেন স্নেহ্রাশ্মি(জ্বিনাভাই দেশাই-য়ের ছদ্মনাম, ১৯০৩-১৯৯১) তাঁর ‘সোনার চাঁদ রুপোর সূর্য'(১৯৬৭) কাব্যগ্রন্থে আছে ৩৫৯টি হাইকু, ৬টি তনকা। ‘তুষারচূড়ায় সূর্যোদয়’ তাঁর অন্য হাইকুগ্রন্থ। হিন্দিতে সচ্চিদানন্দ হীরানন্দ বাৎস্যায়ন ‘অজেয়’( ১৯১১-১৯৮৭) হাইকুর সূত্রপাত করেন, অরি ও করুণা প্রভাময় (১৯৫৯) বইটিতে তিনি কিছু জাপানি হাইকুর হিন্দি অনুবাদ ও তাঁর কিছু মৌলিক হিন্দি হাইকু সংকলিত করেন। সত্যভূষণ ভর্মা জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়য়ে জাপানি ভাষার অধ্যাপক ও দেশের হাইকু চর্চায় অন্যতম নাম। তিনি সরাসরি জাপানি থেকে অনুবাদ ও মৌলিক হাইকুতে উৎকর্ষের ছাপ রেখেছেন। তাঁর লেখা একটি হাইকু

শরতাকাশ

ঢেউয়ের পর ঢেউ 

পেটুক একটা 

ভারতের বিভিন্ন ভাষাতে হাইকুর চর্চা উজ্জ্বল। 

বৃষ্টি পড়ছে 

দেখছি যতটুকু 

বাকিটা শুনি 

 শিরীষ রাই ( মারাঠি ) 


পতঙ্গ পোড়ে

প্রদীপের বাহুতে 

একটু ছাই 

রাম নিবাস ‘পন্থী’ ( হিন্দি) 


বৃষ্টির ফোঁটা – 

বারান্দায় ছড়ানো

বাসমতি ঘ্রাণ 

অমরজিৎ সাথী (পাঞ্জাবি)


ঘরে ঝাপটে 

চড়ুই নিয়ে এল 

আকাশখানি 

মাকিনেন্দু সূর্য ভাস্কর ( তেলেগু) 

বাংলা হাইকুর প্রথম বই সুরেন্দ্রনাথ মৈত্র-এর ‘জাপানী ঝিনুক’ ২১(বিশ্বভারতী , ১৯৩৯/১৩৪৫)। যদিও কবিতাগুলি হাইকুর সব বৈশিষ্টকে মান্য করে না। 

অন্নদাশঙ্কর রায়, বনফুল, নির্মলেন্দু গুণ, মলয় রায়চোধুরীর মতো উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বরা বাংলায় হাইকু লিখেছেন। 

“দৈনিক জনকণ্ঠ”-এ প্রকাশিত ‘হাইকু কবিতার নেপথ্য সন্ধানে’ নামের একটি প্রবন্ধে বজলুল করিম বাহার জানান, ষাটের দশকে তিনি ‘সমকাল’, ‘উত্তরণ’, ‘সাহিত্য’, ‘কাক’ নামক সাহিত্য পত্রিকায় মাঝেমাঝে হাইকু ছাপা হতে দেখতেন । এ সূত্রে তিনি হাইকু রচয়িতা হিসেবে হুমায়ূন খান সবচেয়ে সক্রিয় ছিলেন বলে জানান। এ ছাড়াও তিনি তৎকালে হাইকু রচয়িতা হিসেবে সৈয়দ আলী আহসান (১৯২২-২০০২), সানাউল হক (১৯২৪-১৯৯৩), সাইয়িদ আতীকুল্লাহ ( ১৯৩৩-১৯৯৮) ও শামসুর রহমানের নাম উল্লেখ করে বলেন, ‘তাঁরা কখনো কখনো হয়তো লিখেছিলেন এ ধরণের কবিতা ।’ কিন্তু এদের মধ্যে সৈয়দ আলী আহসানের এ ধারার একটি লেখা ছাড়া বাকিদের কারোরই কোনো হাইকু আমি খুঁজে পাইনি ।”২২ লিখেছেন মুজিব মেহদী। ত্রিভুজাসম্ভাষ বইটিতে তিনি হাইকুর নানাদিক আলোচনা করেছেন, ‘বাংলা হাইকুসাহিত্য’ ও ‘হাইকুর বিশ্ব’-র রূপরেখা তুলে ধরেছেন, লিখেছেন নিয়মনিষ্ঠ হাইকু( হাইকুপ্রহর), সেনেরু( সেনেরুবিতান) এবং বাংলা হাইকু, বাইকু । “বিশেষায়িত বাংলা হাইকুকে বলা হচ্ছে বাইকু। কাঠামোগতভাবে মুক্ত, অর্থাৎ মাত্রাবৃত্তে ৫-৭-৫ রীতির অনুসারী নয় বলে এটি মুক্তক হাইকু হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।”২৩ বাংলা বর্ণমালার প্রতিটি বর্ণ দিয়ে শুরু হওয়া শব্দ দিয়ে(যেগুলি দিয়ে শব্দ শুরু হয় না, সেগুলিকে শুরুর শব্দের মধ্যে রেখে) ক্রমানুসারে লেখা বাইকু বর্ণমালা( বাইকুস্বর ও বাইকুব্যঞ্জন ) ও নানা ভাবনার ৫০টি বাইকুসহায় । 

“ ‘বাইকু বর্ণমালা’ ও ‘বাইকুসহায়’ পর্বে বিষয় সম্পদ ধরে গুণগত বিবেচনায় হাইকু-সেনরু বিভাজন করা হয় নি। ...’বাইকুসহায়’ ভুক্ত বাইকুগুলোর অধিকাংশের গাত্রসজ্জা মুক্তক অক্ষরবৃত্তের, কোনোটা বা মুক্তক মাত্রবৃত্তের। আবার কোনটা এতোই বেয়াড়া যে, কোনো বাংলা ছন্দেই এদের বাগে আনা যায় না ।”২৪ 

২০১৮-য় প্রকাশিত হয়েছে মুজিব তাঁর আরেকটি কবিতর বই‘বাইকু শতক’। 

তাঁর কয়েকটি বাইকু আমরা দেখে নিই, 

উ. 

উড়ন্ত সুখ 

বাঁশি রোরুদ্যমান 

খাঁখাঁ প্রান্তর 

( বাইকু বর্ণমালা ) 

খয়েরি ফড়িং 

স্থির জলে দেখছে নিজের ছায়া 

দূরে একটি বিমান 

( বাইকুসহায় ৩) 

ঝাউয়ের আড়ালে লুকোনো আছে সমুদ্রউচ্ছ্বাস 

গর্জন মুখস্ত করো নুড়িমালা 

বালির বিষাদ বুকে প্রসন্ন সৈকত 

( বাইকুসহায় ২১) 

বাগানে ভর্তি হলাম পাখিদের ক্লাসে 

শিখছি পাতা কাঁপানো ও ফুল ফোটানো

এখনো অনেক দূরে পাতাঝরা দিন 

( বাইকুসহায় ৪৯) 

মুজিব মেহদী প্রস্তাবিত বাইকু তিন লাইনের মুক্তক, মাত্রা বা ধ্বনিসংখ্যার বিধিনিষেধ নেই, নেই বিষয়ের সীমাবদ্ধতা, প্রকৃতি বা ঋতুচিহ্নের আবশ্যিকতা, ছবি আছে, ছবিতে ছবিতে ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া আছে, হাইকুর বিস্ময় আছে। তাঁর বাইকু এতো যে খোলামেলা একটি ফর্ম কিন্তু তিনি নিয়ম মেনে হাইকু লেখার দক্ষতা দেখিয়েছেন আগেই 

মাতাল চাঁদ

নিশার দারোয়ান 

দাঁতাল শীত 

( হাইকুপ্রহর ৩) 

তাই হাইকু-র ব্যর্থতা থেকে নয়, হাইকু-ভাবনাকে বাংলায় প্রসারিত করতেই বাইকু। বাংলায় হাইকু চর্চা নিয়ে মুজিব মেহদীর মূল্যায়ন, “বাংলায় দেখা যায়, একটি নাতিদীর্ঘ সরল বাক্যকে তিন লাইনে বিন্যস্ত করে তাকে হাইকু বলে চালাতে। এটা হাইকু আঙ্গিকের একটা ব্যত্যয়। ... বাংলাভাষায় ইতোমধ্যে অনেকেই হাইকু অনুবাদ করেছেন ও মৌলিক হাইকু লিখেছেন। এসব কাজ যতদূর চোখে পড়েছে, তাতে বলা যায় যে, তা কোনোই সাধারণ রীতির ভিতর দিয়ে এগোয় নি। এটাই স্বাভাবিক মনে হয়। কারণ হাইকু নিয়ে এ যাবৎ মান্য কোনো কাজ বাংলায় হয়ে ওঠে নি, যাকে পরবর্তী হাইকু লেখকগণ সমীহ করতে পারেন। কাজেই সব মিলিয়ে বাংলা হাইকুরাজ্যে এ যাবৎ বিশৃঙ্খলারই জয়জয়কার।এই প্রেক্ষাপটে আমার মনও এবারের জন্য বিশৃঙ্খলার জটে আটকে গেল। ...বাংলা হাইকুকে শেষাবধি আমি যদি বাইকুই বলি, তারেই বা বাধা দেবেন কেন, খোলামন সুবুদ্ধি পাঠক !”২৫ 

দেবব্রত সরকার তাঁর বাংলা হাইকু বইটিতে অক্ষরবৃত্তে ৫-৭-৫ মেনে কবিতা লিখেছেন 

চঞ্চল পোকা

টিকটিকির ধৈর্য

দেয়াল খাড়া ।২৬ 

মলয় রায়চৌধুরী্র হাইকু বিষয় ও প্রকাশভঙ্গিতে স্বাধীন, মাত্রার শাসন থেকে মুক্ত, 

একটি মৃতদেহ

সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলে আছে

পুরুষ মাকড়সা 

তাঁর অন্যান্য রচনার মতোই হাইকুর ভাষাচিত্র ও অভিঘাত স্বতন্ত্র।

ডঃ শেখ আলীমুজ্জামান হাইকুকে ৫-৭-৫ শব্দসংখ্যায় প্রকাশ করতে চেয়েছেন, “পৃথিবীর অনেক ভাষাতেই, হাইকু কবিরা প্রথমেই আটকে গিয়েছেন এই কঠোর নিয়মের বেড়াজালে। তবে বর্তমানে বিদেশী ভাষায় রচিত হাইকুতে সিলেবলের শাসন নেই বললেই চলে। ঋতুর সম্পৃক্ততাও অনেক ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না। এমনকি তিন লাইনের জায়গায় এক বা দুই লাইনের হাইকুও লেখার দাবীও করছেন অনেকে।

আমি হাইকু রচনা করতে গিয়ে ১৭টি সিলেবলের স্থানে ব্যবহার করেছি ১৭টি শব্দ, কারণ আমার মনে হয়েছে সেটাই বাংলা ভাষায় রচিত হাইকুর নিয়মকে আরো সহজবোধ্য করতে পারে। ৫-৭-৫ পদ্ধতিতে, তিন লাইনের মৌলিক ব্যাকরণ অনুসরণ করেছি একান্ত নিষ্ঠায়। অনেক হাইকু ঋতু বিস্মৃত, কারণ অনেকের মতো আমিও মনে করি তা হওয়া যায়। জাপানের চার ঋতুর তুলনায় আমাদের রয়েছে ছয় ঋতু, কাব্যের বাতাবরণ দেশে দেশ ভিন্ন হবে সেটাই স্বাভাবিক। বিদেশী ভাষায় হাইকু রচনার ক্ষেত্রে, হাইকু- শব্দটি, হাইকু ও সেনরিউ এমনকি তানকা, এ সব মিলিয়ে ব্যাপক অর্থেই ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে শব্দের আড়ালে শব্দের যে অন্য অর্থ আরোপ বা অন্য ইমেজ সৃষ্টি করা, তা বজায় রেখেছি, কারণ এটাই হলো হাইকুর আত্মা ।”

ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘সন্দীপন: জাপানি হাইকু, বিশাখ ও মাত্রিক কাব্য’ বইতে ‘বিশাখ’ কবিতা-আঙ্গিকের প্রস্তাব করেছেন, “জাপানী হাইকুতে মানুষের সংসারের দ্বন্দ্ব, সুখ, দুঃখ প্রভৃতির স্থান নেই। কিন্তু বর্তমানের দাবি মানুষের জন্য স্থান, মানুষের অধিকার।...হাইকুর তত্বের অমানবিক দিকটি বাদ দিলে হাইকু তার নিজস্ব সত্তা হারিয়ে ফেলে। 

হাইকুর প্রাণ তার দর্শনে। সেই দর্শনই যদি বদলে গেল, তবে পড়ে থাকল শুধু তার কাঠামোটা, আর এখানেই আমাদের বিশাখ কাব্যের জন্ম । ভারতীয় নিসর্গ প্রকৃতির মধ্যে নূতন দর্শনের ওপর ভিত্তি করে হাইকুর কাঠামোয় যে কাব্য গড়ে উঠল সেটাই বিশাখ কাব্য। রক্ষা করা হ’ল তার তিন চরণ ও সতেরো মাত্রার সীমানা। বদলে দেওয়া হ’ল তার দর্শন, তার প্রাণকেন্দ্র, দর্শনে আনা হ’ল মানুষের সংসারকে, বরণ করা হ’ল কালস্রোতে তার পরিবর্তনকে ।” ২৭ 

বলা যেতে পারে বিশাখ হল মানবিক হাইকু, যা সেনরুরই নামান্তর। 

“ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বই থেকে একটি অন্ত্যমিলযুক্ত ও একটি অন্ত্যমিলহীন ভুক্তি উদ্ধার করা যাক :

১ .

রাত নিস্তব্ধ

ঝাউয়ের ওপারে

ঢেউয়ের শব্দ 

২ 

বকের ছানা

চলন বিলে লাফ!

মাছের ঝাঁক। 

উল্লেখিত দুটি বিশাখভুক্তির দুটোই হাইকু, যার প্রথমটা অক্ষরবৃত্ত এবং দ্বিতীয়টা অক্ষরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্ত দুই রীতিতেও ৫-৭-৫ চালে সিদ্ধ। সুতরাং দেক্ষা যাচ্ছে সময়, ভূগোল কিংবা বিশাখকর্তার মন-মস্তিষ্ক কোনো জায়গা থেকেই‘হাইকু তার নিজস্ব সত্তা হারিয়ে ফেলে নি। ভাগ্যিস হারায় নি !”২৮ 

শশাঙ্কশেখর পাল হাইকুচর্চা করছেন অনেকদিন, ‘হাইকু চালে বাংফু’ নামে তাঁর একটি বই প্রকাশিত হয়েছে । তাঁর কথায়, “নিজের মতো করে একটা পথ তৈরি করেছি মাত্র । এখানে অক্ষরবৃত্তের ধারণাকে ধরেই লেখার চেষ্টা করেছি । কবিতাগুলো ১৭টি অক্ষরবৃত্তে ভাগ করা। এক লাইনে নয়, তিন লাইনে ভাগ করেছি। ১৭টি ছাড়াও ১৬টি অক্ষরবৃত্তে কয়েকটি কবিতা লিখেছি, সেগুলো এক লাইনেই রেখেছি।

...

কবিতাগুলোকে হাইকু বলতে চাই না ।

জাপানি হাইকু + বাংলা হ্রস্ব কবিতা = বাংকু > বাংফু ।”২৯ 

বইটি থেকে দুটি বাংফু 

তেলে মাথা

 কবিতা উৎসব

 কী নান্দনিক 

এবং 

আকাশে নৌকা

   কাননে রতিফুল

   ভ্রমর মাঝি 

রহিম আখতার কল্পনা তাঁর ‘তিনশত বাংলা হাইকু’ বইটিতে ‘বাংলা হাইকু : পরিপ্রেক্ষিত বয়ান’ শিরোনামের লেখাটিতে প্রস্তাবনা করেছেন, “ ‘হাইকু’ রচনার কবিকে প্রথমত হতে হবে প্রকৃতই কবি অর্থাৎ সহজাত কবিপ্রতিভার অধিকারী, তাঁর থাকতে হবে নিখুঁত ছন্দ-জ্ঞান, প্রতীক ও চিত্রকল্প নির্মাণের দক্ষতা, তীক্ষ্ণ সমাজ-সচেতনা, উন্নত মানবিক মূল্যবোধ, রসবোধ বা sense Of humour, সর্বোপরি একটি বিশাল শব্দভাণ্ডার,যাতে প্রতিটি শব্দের বিভিন্ন মাত্রা বা সিলেবলসম্পন্ন অনেক প্রতিশব্দ সঞ্চিত আছে। কারণ ৫-৭-৫ মাত্রার বা অক্ষর বা Silable-এর বিন্যাসে তিনি যে বিশেষ কবিতা লিখতে যাচ্ছেন, তাতে আবশ্যিকভাবে থাকছে –

ক. যথাযথ মাত্রা বা অক্ষরবিন্যাস ( ৫-৭-৫) 

খ. একটি ছবি, চিত্র বা চিত্রকল্প 

গ. চিত্রকল্পটির মাধ্যমে ক্ষেত্রবিশেষে একটি প্রতীকী অর্থ, যা চিরায়ত মানবিক সম্পর্ক, ব্যঙ্গাত্মক সমাজ পর্যবেক্ষণ, সমকালীন মূল্যবোধ ইত্যাদিকে প্রকাশ করে ।

ঘ. কোনো বিশেষ কাল বা ঋতু-নির্দেশক উপাদান। ঋতু-সংশ্লিষ্ট বর্ণনা সবক্ষেত্রে এখন আর আবশ্যিক নয়, তবে এ সংযোজনটি সম্ভব হলে উত্তম ।

ঙ. সংবেদনশীল ব্যঞ্জনাময় শব্দের সমন্বয়, যাতে কবিতার লালিত্য ও আকর্ষণীয় ছন্দদোলা পাঠককে কবিতার সঙ্গে একাত্ম করে ।

চ. সম্ভব হলে অন্ত্যমিল । তবে অন্ত্যমিল না থাকাটাই এক সময় ‘হাইকু’র বৈশিষ্ট্য বলে গণ্য হতো । বাংলা হাইকু রচনার নিরীক্ষাপর্বে দেখা গেছে যে, সকল বৈশিষ্ট্য ও নীতিমালা বজায় রেখে অন্ত্যমিল থাকলে এই বিশিষ্ট কবিতা আরো বেশি হৃদয় সংবেদী ও শ্রুতিমধুর হতে পারে ।”৩০ 

বইটি থেকে দুটি হাইকু 

সবুজ ক্ষেতে

হলুদ ফুল রাখে

গালিচা পেতে 

( পর্ব : প্রকৃতি ) 

এবং 

ঘর বাঁচাই

জীবন খেলাঘরে 

সাপ নাচাই 

( পর্ব : নর-নারী ) 

হাইকু ও সেনরু, দুই ধরণের কবিতাই আমরা পেলাম, কিন্তু হাইকু-তে কী কী থাকবে – এই নিয়ে তাঁর বক্তব্যের অনেকটাই হাইকুর ধারণার সাথে মিলল না । 

বাংলা হাইকু কি তবে এই পথে? 

কোন পথে ? কোনো নির্দিষ্ট অভিমুখ কি দেখা যাচ্ছে? 

হাইকু না ‘হয়ে’ উঠে তা কি ‘তিন লাইনের কাব্য’ থেকে যাচ্ছে ? 

বিধিনিষেধ ভেঙে স্বতন্ত্র কোনো কাব্য-প্রকরণ ?

এই পথে মৌলিক হাইকু চর্চার পাশাপাশি জাপানি হাইকুর বাংলা অনুবাদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ । রবীন্দ্রনাথকৃত বাশোর ‘পুরোনো পুকুর’ দিয়ে আমাদের ভাষায় হাইকুচর্চা শুরু, এই কবিতাটি কতজনকে অনুবাদ করলেন ! 

ডোবাটা যেন কালের 

ব্যাঙটা সেখানে লাফিয়ে পড়ল

শব্দ হলো জলের।

( পলাশ বরণ পাল )

পুরোনো পুকুর

 ব্যাঙের লম্ফ ঝপাং ঝপ 

ছরছর ছলাৎ ছল। 

( দাউদ আল হাফিজ ) 

এঁদো পুকুর

লাফিয়ে পড়ে ব্যাং 

জলোল্লাস 

( মুজিব মেহদী )

বাশো-র কবিতার প্রতি আমাদের আকর্ষণ ফুরনোর নয় এবং তাঁর কবিতা অনুবাদের আগ্রহও। এই সময়েও আমরা প্রকাশিত হতে দেখি, তাঁর হাইকু, হায়বুনের অনুবাদ, তাঁকে নিয়ে লেখা বই, সাম্প্রতিক প্রকাশিত চন্দন ঘোষ-এর মাৎসুও বাশো ও জ্যোৎস্নাময় হাইকু(স্ক্রিপ্ট, ২০১৩), দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য-র গভীর উত্তর সরণীতে (সৃষ্টিসুখ, ২০১৪) , অগ্নি বসু-র কেন ভালো বাশো (কুবোপাখি, ২০১৬)। 

ক্যোউকো নিওয়া ও গৌরী আইয়ুব-এর অনুবাদে দূর প্রদেশের সংকীর্ণ পথ( দে’জ, ১৯৯০) বাংলায় বাশোচর্চার অন্যতম বই। বাশো-র নানা হাইকু আমারা পেয়েছি বাংলায় ভাষান্তরে 


ছোট্ট কাঁকড়া

উঠছে আমার পা বেয়ে –

কি ঠাণ্ডা জল !

( অনুবাদঃ সন্দীপকুমার ঠাকুর ) 


কী গভীর সে নৈঃশব্দ্য

মনে হয় যেন ঝিঁঝিঁর ডাককেও

ধীরে ধীরে শুষে নিচ্ছে শিলাখণ্ডগুলি 

( অনুবাদঃ গৌরী আইয়ুব )

শীত দিন

আমার ঘোড়ার পিঠে

ছায়াও জমাট 

( অনুবাদঃ বীতশোক ভট্টাচার্য ) 

জানলা বেয়ে, তুচ্ছ আমার কুঁড়েঘরে

চৌকোনা এক জ্যোৎস্না এসে

আছড়ে পড়ে... 

 ( অনুবাদঃ অগ্নি বসু)

পেয়েছি অন্যান্য হাইজিনের রচনার অনুবাদও 

তাকারাই কিকাকু-র লেখা 

মাছধরা জাল

রূপালী সাদামাছেরা

একসাথে কাঁপছে । 

 ( অনুবাদঃ সন্দীপকুমার ঠাকুর) 

আগেইয়োসা বুসোন-এর 

কী চাঁদ –

চোরও গান গাইতে 

থেমে যায় 

(অনুবাদঃ বীতশোক ভট্টাচার্য )

কোবায়িশি ইসসা-র 

যা কিছু আমি ছুঁই

আলতভাবেও হায়

হুল ফোটায় কাঁটাঝোপ 

( অনুবাদঃ মলয় রায়চৌধুরী )

মাসাউকা শিকি-র 

 

পিয়ার্স ফলেছে 

যুদ্ধের পরে

বিধ্বস্ত বাড়ি  

( অনুবাদঃ সালেহা চৌধুরী )


তইয়োজো হাৎসুইয়ামা-র 

স্বপ্নের ভিতর 

সমুদ্রে নত মেঘে

সওয়ার হয়েছি 

( অনুবাদঃ নির্মলেন্দু গুণ )


জাপানি ছাড়া অন্য ভাষার হাইকু-ও অনুদিত হয়েছে বাংলায় 

ইংরেজি থেকে

অ্যালেন গিন্সবার্গ-এর লেখা 


দাড়ি কামানো ছেড়ে দিয়েছি 

কিন্তু যে-চোখ আমায় দেখছিল

রয়ে গেছে আয়নায়

( অনুবাদঃ মলয় রায়চৌধুরী)


জ্যাক কেরুয়াকের হাইকু 


শহরতলি জুড়ে বরফের ঝড়

পোস্টম্যান 

আর কবি হেঁটে যাছে

( অনুবাদঃ শৌভিক দে সরকার)

স্প্যানিশ থেকে 

আন্তোনিও মাচাদো-র হাইকুপ্রায় কবিতা


কারো সঙ্গে কথা বলতে হলে

প্রথমে প্রশ্ন করো 

তারপর শোনো 

(অনুবাদঃ মুজিব মেহদী ) 

অক্টাভিও পাজ-এর 

দিন মুঠো খোলে 

তিনটি মেঘ

 সামান্য শব্দ 

  ( অনুবাদঃ সালেহা চৌধুরী )

সুইডিশ কবি টমাস ট্যান্সট্রমার-এর 

সমুদ্র একটি দেয়াল।

কানে আসছে শঙ্খচিলদের কান্না

তারা আমাদের ইশারা করছে ।

( অনুবাদঃ গৌতম চৌধুরী ) 

বাংলায় মূল তিনটি ছন্দের কোনটি গৃহীত হবে ৫-৭-৫-এ, নাকি তা হবে মুক্তক ?

সুরজিৎ সুলেখাপুত্র ‘রূপশালী’ (প্রথম বর্ষ,প্রথম সংখ্যা,২০১৫) পত্রিকায় একটি নিবন্ধে অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত ও স্বরবৃত্ত – তিনভাবেই হাইকুর প্রস্তাব রেখেছেন এবং উদাহরণ হিসেবে লিখেছেন 

 মাত্রাবৃত্তে ,  স্বরবৃত্তে ও  অক্ষরবৃত্তে

১। গান থামল ।  চেতনায় বাজে  বন্দিনী জল

২। নীরবতা কাঁপছে –   আঁধারে লীন ঝিঁঝি ডাক... চক্রেচক্রে জীবন্ত

৩। শুনতে পাও ?  জগৎ ঘুমায়   মৃত্যু ছোঁয়ানো 

যদিও সামগ্রিকভাবে মাত্রাবৃত্তই অধিক গৃহীত এবং তা হয়তো জাপানি ‘অন’-এর সবচেয়ে কাছাকাছি; যদিও কবির বিবেচনার ওপরেই নির্ভর করবে তাঁর হাইকুর জন্য কোন কাঠামো তিনি নির্বাচন করবেন। 

বাংলার মতোই পৃথিবীর অন্যান্য ভাষাতেও হাইকুর ধারণা নানামুখী। 

হাইকু ছিল জাপানের সম্পদ, এখন তা বিশ্বের। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে নাগাসাকিতে কমিশনার হিসেবে নিযুক্ত নেদারল্যান্ডের হেন্ড্রিক ডোয়েফ (১৮৬৪-১৯৩৭)-কে বলা হায় ‘পাশ্চাত্যের প্রথম মানুষ যিনি হাইকু লেখেন’। তাঁর একটি হাইকু

হাত বাড়াও

বজ্রের চেয়ে দ্রুত

পথে বালিশ 

বেসিল হল চেম্বারলিন ( ১৮৫০-১৯৩৫, ব্রিটিশ, জাপানে আধ্যাপক ছিলেন), উইলিয়াম জর্জ অ্যাস্টন (১৮৪১-১৯১১,ব্রিটিশ,কূটনীতিক) জাপানি সাহিত্য কে পৃথিবীর সামনে তুলে ধরেন। ‘রিডার’ পত্রিকায় ১৯০৪-এর ফেব্রুয়ারিতে জাপানি কবি-আলোচক ইওন নোগুচি ( ১৮৫৭-১৯৪৭) ‘আমেরিকান কবিদের প্রতি’ এই শিরোনামে একটি লেখায় হোক্‌কু লেখার নিয়মকানুনসহ নিজের কিছু ইংরেজি হোক্‌কু প্রকাশ করেন ও শেষে “আমেরিকান কবিগণ, অনুরোধ করি,আপনারা চেষ্টা করবেন জাপানি হোক্‌কু লেখার।” এই বার্তাটি ব্যক্ত করেন। প্রায় সেই সময়েই ইংরেজি ও ফরাসিতে হোক্‌কু প্রকাশ করেন সাদাকিচি হার্টম্যান(১৮৬৭-১৯৪৪, তিনি বাবার দিক থেকে জার্মান, মায়ের দিক দিয়ে জাপানি)। রেজিন্যান্ড হোরেস ব্লীথ (১৮৯৮-১৯৬৪), কেনেথ ইয়াসুদা(১৯১৪-২০০২), হ্যারোল্ড গৌল্ড হ্যানডারসন ( ১৮৮৯-১৯৭৮) তাঁদের লেখালেখি ও অনুবাদ দিয়ে হাইকু সম্পর্কিত ধারণা সারা পৃথিবীতে প্রসারিত করেন। 

ফ্রান্সে হাইকু-কে প্রথম পরিচিত করান পল-লুই কওচদ (১৮৭৯-১৯৫৯); একটি বৃত্তি নিয়ে তিনি জাপান যান আর হাইকুর প্রেমে পড়েন। দেশে ফিরে আঁদ্রে ফাও, অ্যালবার্ট পনকিন-এর সাথে মিলে ‘জলপথে’ নামে একটি হাইকু সংকলন প্রকাশ করেন। ১৯০৬-এ প্রকাশিত হয় কওচদ-এর লেখা ‘হাইকাই, জাপানি গীতিময় ছোটকবিতা’ আর ১৯১৬-তে‘এশিয়ার ঋষি ও কবিরা’। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ১৯১৫-য় প্রকাশিত জুলিয়েন ভোকান্স-এর হাইকুপুস্তক ‘যুদ্ধের শত দর্শন’-এ কবি সমসাময়িক বিষয়কে হাইকুতে নিয়ে আসেন

মাটির গর্তে

বিশাল সৈন্যের মুখোমুখি

দুজন মানুষ

১৯২০-তে জাঁ-রিচার্ড ব্লচ(১৮৮৪-১৯৪৭) উদ্যোগে ‘নবফরাসি পর্যালোচনা’ পত্রিকার সেপ্টেম্বর, ১৯২০ সংখ্যায় ‘ফরাসি হাইকুর ছোট সঞ্চয়ন’-এ জাঁ পলহান-এর ভূমিকাসহ ১২জন ফরাসি কবির ৮২টি হাইকু। 

রজার গিলবার্ট লেক্মতে ( ১৯০৭-১৯৪৩) এক বিস্ময়কর নাম, মাত্র ১৬ বছর বয়সে লেখেন 

বেড়াল চোখ

দুই যমজ চাঁদ 

যেন রাত্তিরে 

রেনে মব্লাঁ, রেনে দ্রুয়ার্ত, রেনে মোনার্ড, পল এল্যুয়ার, পল ক্লদেল ফরাসি হাইকুচর্চায় উল্লেখযোগ্য নাম।৩১ 

কওচদ-এর নিবন্ধ পড়ে ইমেজিস্ট কবি-তাত্ত্বিক এফ. এস. ফ্লিট ( ১৮৮৫-১৯৬০)-কে এতটাই প্রভাবিত করে যে তিনি ইমেজিস্ট আন্দোলনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব এজরা পাউন্ড(১৮৮৫-১৯৭২)-কে এ ব্যাপারে জানান। অ্যামেরিকান কবি এমি লাউয়েল হাইকু নিয়ে জানতে লন্ডনে এসে পাউন্ডের সঙ্গে দেখা করেন ও দেশে ফিরে সতীর্থদের এই আঙ্গিক নিয়ে অবহিত করেন। ইমেজিস্ট কবিদের লেখালেখির ওপর হাইকুর প্রভাব উল্লেখযোগ্য। 

গত রাতে বৃষ্টি । 

 এখন, জনশূন্য ভোরে 

 নীলকণ্ঠের কান্না।

(এমি লাউয়েল)

এজরা পাউন্ডের ‘মহানগরের এক স্টেশনে’ ( ১৯১৩) কবিতাটিকে কেউ কেউ ইংরেজিতে লেখা প্রথম হাইকু বলে ত্থাকেন 

ভিড়ের মধ্যে মুখগুলির ছিরি 

শুকনো ভেজা ডালে পাপড়ি 

দু লাইনের এই কবিতাটির অসাধরণ চিত্রকল্প ও কাব্যিক প্রকাশ সত্তেও একে হাইকু বলতে এনিয়ে অনেকেরই আপত্তি আছে।

ই ই কামিন্স-এর তিনটি হাইকু প্রকাশ পায় ১৯১৬-য় 

তাকে নিশি ডাকে 

ভোর আর সূর্যাস্ত থেকে

যে কবিতা বানায়

অ্যামেরিকায় বিট প্রজন্মের কবিরা হাইকুতে আকৃষ্ট হয়েছেন, হাইকু লিখেছেন গ্যারি স্নাইডার, অ্যালেন গিন্সবার্গ, জ্যাক কেরুয়াক। স্নাইডার জাপানে জেন মন্দিরে ইংরেজি ভাষার প্রশিক্ষক হিসেবে যোগ দেন, জেন-উদ্ভাসে ডুব দেন এবং বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। 

এই সকাল :

বালতিজলে ভাসে মুখ

 ডুবন্ত চুহা 

 (গ্যারি স্নাইডার)

একটি বেলুন আটকে আছে

গাছে সন্ধ্যা নামছে 

সেন্ট্রাল পার্কের চিড়িয়াখানায় 

(জ্যাক কেরুয়াকঃ অনুবাদঃ শৌভিক দে সরকার) 

উন্মাদটি

চলচিত্র থেকে বেরিয়ে এল:

মধ্যাহ্নভোজকালীন রাস্তা 

( অ্যালেন গিন্সবার্গ)

জাপানের বাইরে প্রথম হাইকু পত্রিকা ‘অ্যামেরিকান হাইকু’ প্রকাশ পায় ১৯৬৫-তে, সেই সংখ্যা থেকে

তেঁতো সকাল

চড়ুইরা বসে আছে

ঘাড় ছাড়াই 

( জেমস ডব্লু. হ্যাকেট )

শালুকফুল

জল থেকে বেরোনো 

নিজের থেকেও 

( নিক ভার্জিলিও) 

সে দেশে হাইকু নিয়ে নানা পত্রিকা, বই, অ্যান্থলজি, হাইকু সোসাইটি। নিরীক্ষার হাইকু থেকে তৈরি হওয়া আরও নানা প্রকরণ, অ্যামেরিকান হাইকু প্রকরণ, এক পঙ্‌ক্তির হাইকু, মোনোকু, অ্যামেরিকান সেন্টেন্স, সেনকু ... আরও কত ফর্ম। উইলিয়াম জে. হিগিনসন, জন অ্যাশবেরি, জিম ক্যাসিয়ান, সোনিয়া স্যাঞ্চেজ, মার্লিন মাউন্টেন, গ্যারি গে, বিলি কলিন্স-এর মতো কবিরা নতুন নতুন দিয়েছেন হাইকুকে। ৩২ 

কিছু বোলা না

সময় ধ্বসে পড়ছে

বনের মাঝে 

(সোনিয়া স্যাঞ্চেজ) 

পাখি গায়:

রং

সঙ্গীতের 

( গ্যারি গে)

ব্রিটেনে লাফকাডিও হের্ন ( ১৮৫০-১৯০৪) ও বেসিল হল চেম্বারলিন(১৮৫০-১৯৩৫) হোক্‌কু-কে প্রাথমিক পরিচিতি দেন। ইমেজিস্ট আন্দোলন সেখানেও কবিতাকে দারুণভাবেই প্রভাবিত করে। “ব্রিটিশ হাইকু সোসাইটি” নানা কর্মকাণ্ডে প্রসারিত হয়ে চলেছে। জেমস কিরেপ, জন বার্লো,ওয়েন্ডি কোপ, রিচার্ড টিনডাল সে দেশের হাইকুবিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ 

 নভেম্বরের সন্ধ্যা 

চাঁদ উঠেছে, পাথরেরা স্থির, 

পানশালারাও খোলা ।

(ওয়েন্ডি কোপ)৩৩ 

কানাডায় ভ্যাঙ্কুয়ারকে অনেক জাপানি বংশোদ্ভূতের বসবাসের জন্য বলা হয় 'ছোট টোকিও' । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পল হারবার আক্রমণের সঙ্গেসঙ্গেই এঁদের 'বহিরাগত শত্রু' চিহ্নিত করা হয়ে, প্রচুর মানুষকে পাঠানো হয় অস্থায়ী শিবিরে । কইবো ওইয়া ‘পাথরের স্বর:জাপানি কানাডিয়ান ইসেইদের যুদ্ধকালীন লেখালেখি' (ইসেই হল প্রথম প্রজন্মের জাপানি অভিবাসী) বইটিতে'কযেদি'দের কলিত করেন দিনলিপি,চিঠিপত্র, কবিতা। এই বইটিতে আমরা যে হাইকুগুলি পাই তা সম্ভবত কানাডায় প্রথম হাইকুর নিদর্শন । সেইরকম একটি কায়রু ইকেদা-র ডায়েরি থেকে 

  

পার্বত্য জীবন 

  শুকনো কাঠ জোগাড় 

  বুড়োর উপযুক্ত কাজ 

১৯২৮এ প্রকাশিত সে দেশে ফরাসি হাইকুর প্রথম , সিমোন রৌতিযার-এর ১৪টি ফরাসি হাইকুর সংকলন 'অমর বয়ঃসন্ধি' থেকে 

আমার হৃদয় তোমার অপেক্ষায়/এখনো নীরবতা/ পাতাদের প্রভুত ঝরে পড়/

ক্লারা প্রাট-এর ১৯৬৫তে বেরোনো 'হাইকু' ওদেশে প্রথম ইংরেজি হাইকুর বই। 

রড উইলমুট, জর্জ সয়েদে, বেট্টি ড্রেভনিয়ক, ডরোথি হাওয়ার্ড হাইকুচর্চায় উজ্জ্বল নাম । 

 সূর্যোদয়: 

পক্ষ ভুলে যাই 

 যুক্তির 

(জর্জ সয়েদে)

কানাডার প্রবাদপ্রতিম কবি-গীতিকার-গায়ক লেনার্ড কোহেন(১৯৩৪-২০১৬)-এর 'পৃথিবীর মশলার কৌটো' বই থেকে হাইকুর মতো একটি কবিতা 

 গ্রীষ্ম হাইকু 

 নীরবতা 

 আরও গভীর নীরবতা 

 ঝিঁঝিঁরা যখন 

 ইতস্তত করে ৩৪ 

মেক্সিকোর কবি জোসে জুয়ান তাবলাদা ( ১৮৭১-১৯৪৫)-র স্প্যানিশ কবিতার বই ‘একদিন, সংশ্লেষিত কবিতা’ (১৯১৯-)য় শিরোনামযুক্ত হাইকু ছিল ৩৭টি, এটি ‘জাপানের বাইরে লেখা প্রথম মৌলিক হাইকুর বই’। তাঁর একটি

ব্যাঙেরা 

কাদার ঝোপ

অন্ধকারের পথে 

ব্যাং লাফায় 

১৯২২-এ প্রকাশিত তাঁর ‘পুষ্পাধার’ বইটিতে ছিল ৬৮টি হাইকু। তাবলাদা-র মৃত্যুর পর তাঁর সম্পর্কে পড়াশোনা করতে গিয়ে জাপানি ও ক্রমে চিনা সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী হন অক্টাভিও পাজ ( ১৯১৪ -১৯৯৮), ১৯৫৫-তে প্রকাশিত বই ‘আলগা পাথর’-এ অনেক হাইকু রেখেছিলেন তিনি ।

পাজ-এর একটি হাইকু 

চক্ষু খুলি

কটি গাছ গজালো

বিগত রাতে 

 ( অনুবাদঃ মুজিব মেহদী) 

এইকিচি হায়াশিয়া-র সঙ্গে স্প্যানিশে অনুবাদ করেন বাশো-র ‘অন্তরের সরু পথে’ (১৯৫৭)। মেক্সিকোয় হাইকুর ইতিহাসে এছাড়াও উল্লেখযোগ্য কার্লোস গুটিয়ারেজ ক্রুজ ( ১৮৯৭-১৯৩০),রাফায়েল লোরেঞ্জো (১৮৯৯-১৯৭৪),,জোসে রুবেন রোমারিও( ১৮৯০-১৯৫৩), ফ্রান্সিসকো মন্টেভের্দে গার্সিয়া-ইকাসবালসেটা(১৮৯৪-১৯৮৫)।৩৫ লোরেঞ্জো-র একটি লেখা

শ্বেত হংসীরা 

রাত্রিটির নীচে:

বিস্ময়চিহ্ন 

স্প্যানিশ হাইকু যদিও লাতিন আমেরিকায় শুরু এবং বিকশিত হয় স্পেনেও হাইকুর পরম্পরা আছে। স্পেনের অনেক কবিই লিখেছেন হাইকু৩৬

 কালো জলের ধারে 

 সমুদ্র আর জুঁইয়ের গন্ধ 

 মালাগায় রাত্রি 

(আন্তোনিও মাচাদো )

  ( মালাগা স্পেনের বন্দর শহর) 

আরেক আন্দুলেশিয়ান কবি জুয়ান রমন জিমেনেজ-এর লেখা 

 গাছে ফুল ফোটে 

 প্রতিদিন রাত্রি তুলে নেয় 

 অর্ধেক ফুল 

জার্মান ভাষায় হাইকুর ইতিহাস বেশ পুরোনো।৩৭ 

১৮৯৮এ লেখা পল আর্নেস্ট-এর 

  শালুকফুল 

গভীর থেকে উঠে আসা 

জললহরী 

কার্লি ফ্লোরেঞ্জ থেকে উলি বেকার এই ভাষায় হাইকুচর্চার ইতিহাস বেশ বিস্তৃত। 

সুইডিশ ভাষায় জান ভিন্তেলেস্কু-র অনুবাদ 'জাপানি ছোট গীতিকাব্য' প্রকাশিত হয় ১৯৫৯। সেই বছরই ২০১২-য় নোবেলবিজয়ী সুইডিশ কবি টমাস ট্রান্সট্রমার হাইকুতে আগ্রহী হন ও ৯টি হাইকু লেখেন, ২০০১-এ প্রকাশিত তাঁর ছোট্ট বই 'কারগার'- এ সেগুলি সংকলিত। 

 পলাতক যখন ধরা পড়ল 

 তার পকেট ভর্তি 

 ব্যাঙের ছাতায় 

পরে আরও হাইকু লিখেছেন তিনি। 

 মৃত্যু ঝুঁকে আছে 

 আমার ওপর, দাবার একটা সমস্যা 

 আর তার সমাধান

সুইডেনে আরও অনেক কবিই হাইকুর মায়ায় জড়িয়েছেন

   রাষ্ট্রীয় শোকমিছিল- 

   পথচারীদের যেতে বলা হচ্ছে 

   রাস্তার অন্য পাশে 

    ( লার্ক গ্রানস্ট্রম )৩৮ 

জাপানি হাইকু অনুবাদ ও মৌলিক লেখা মিলিয়ে রাশিয়ার হাইকু চর্চা, নিকোলাই গুমিলিয়ভ-কে বলা হয় ‘রাশিয়ান হাইকুর জনক’। ১৯১৭-য় লেখা তাঁর একটি

  হোক্কা

  হরিণ চোখের মেয়েটি

  এক অ্যামেরিকানকে বিয়ে করতে যাচ্ছে 

  কেন যে কলম্বাস অ্যামেরিকা আবিষ্কার করেছিলেন?! 

এটি সেনরধর্মী, এটিএবং অন্যন্য রাশিয়ান হাইকুতে নিজস্বতা লেগে আছে যা প্রথাগত হাইকু থেকে আলাদা৩৯ 

  

তুমি জানো যে কাস্তে চাঁদ

  স্ফটিকের পেয়ালা ... আমি

  এর থেকে পান করতে চাই

    ( 

ওলগা চেরেমশানোভা)  

গোরস্থানেও, দুঃখের ফুল থেকে, মৌমাছিরা মধু খায় 

  ( এডওয়ার্ড পাসনেভ) 

ইতালিতে মারিও চিনি লাতিন, চিনা ও জাপানি থেকে বেশ কিছু অনুবাদ করেছিলেন । তাঁর লেখা কবিতা মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয় । 

  হাইকাই

তিন লাইনে

  পূর্ণ কবিতা, হয়তো

  পূর্ণ জীবন

  অপরাহ্ণ 

  সব বিশ্রামে

একইরকম জাড্যে 

আলো ও ছায়া 

ইতালির অন্যতম পরিচিত কবি আন্দ্রে জানজোত্তো বেশ কিছু হাইকুধর্মী কবিতা লিখেছেন 

  রেশমের সূক্ষ্ণ প্রসাধন

  দূরত্বের প্রতিফলনে –

  সব সহজ চিন্তাই কাছে মনে হয় 

ফ্যাব্রিজিও ভার্জিলি, ফিওরেঞ্জা আলিনেরি, আন্তোনেল্লা ফিলিপ্পি প্রমুখেরা সে দেশের হাইকুচর্চায় বিশিষ্ট।৪০ 

ওয়েনচেসল্যু দে মোরেস ( ১৮৫৪-১৯২৯) পর্তুগিজ ভাষায় প্রথম হাইকু অনুবাদ করেন, যদিও তাঁর দেশ ব্রাজিলে হাইকু জনপ্রিয় হয় অনেক পরে। ১১৯০-এ মনটেরিও লোবাটো(১৮৮২-১৯৪৮) বাশোর ৬টি হাইকুর অনুবাদ করেন । শুই উএৎসুকা ব্রাজিলে প্রথম জাপানি হাইকু লেখেন, ১৯০৮-এ অভিবাসীদের জাহাজ যখন স্যান্টোস বন্দরে আসছে পাহাড়ের ঢাল দেখে উএৎসুকা লেখেন

অভিবাসী জাহাজ

আসছে: ওপর থেকে আমরা দেখছি

শুকনো জলপ্রপাত 

ওয়াল্ডোমিরো সিকুইরা জুনিয়ার , আফ্রানিও পিক্সোটো, গুয়েলহার্মে দ্য আলমেডা, ওলগা স্যাভারি, অ্যালিস রুইজ – ব্রাজিলের হাইকু কবিতাকে সমৃদ্ধ করেছেন ।৪১ 

কেবল সাহসীরাই সুখী 

জিগ্যেস না করেই, বাতাস 

ফুলগুলো মাটিতে ঝরায় 

আমার সাহসে কুলোত না 

১৯৪১-১৯৪৫-এ জাপান-অধিকৃত ফিলিপিনসে হাইকুচর্চা শুরু হয়। সে দেশে প্রথম উল্লেখযোগ্য হাইজিন গঞ্জালো কে. ফ্লোরেস (সেভারনিও গেরুনদিও নামেও পরিচিত) তাঁর একটি হাইকু 

আমন্ত্রণ

একলা ঘাস

চুপ-নদীর ধারে

এসো, প্রিয় হে 

বর্তমানে হাইকু নিয়ে উৎসাহ ও নিরীক্ষায় ফিলিপিনসের নাম করতেই হয়।৪২ 

আফ্রিকায় হাইকুর প্রসারে অন্যতম নাম সেনেগালের কবি সনো উচিদা। তাঁর একটি লেখা

মহাকাশ ঢাকা 

সাহারার ধুলোয়

সাদা সুর্য নড়ে না 

নাইজিরিয়ার ইমানুয়েল সাম্পসন আব্দালমাসিহ্‌ তৈরি করেছেন ‘আয়না হাইকু’র প্রকরণ, অন্য হাইকু সংস্কৃতিতেও এর দেখা মেলে ।৪৩ 

 বৃষ্টিতে হেঁটে হেঁটে   শ্রাবন কনসার্ট

ছাতারা গাইছে নানান সুরে  ছাতারা গাইছে নানান সুরে 

শ্রাবন কনসার্ট  বৃষ্টিতে হেঁটে হেঁটে

(ইমানুয়েল সাম্পসন আব্দালমাসিহ্‌ ) 

ঘানার কবি আদ্‌জেই আগ্যেই বাহ-এর উলেখযোগ্য হাইকু-সেনরু বই ‘আফ্রিকু’৪৪ থেকে 

গাঁয়ের রাত

জোনাকিদের আলো

সর্বত্র 

ইরানে হাইকু রচনায় কাভা গোহারিন, সৈয়দ আলি সালেহি-র সঙ্গেই উচ্চারিত প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক ও কবি আব্বাস কিয়ারোস্তামির-র নাম৪৫  

একজোড়া ট্রাউট 

পাশাপাশি শুয়ে আছে 

থালার সাদা বিছানায় 

( আব্বাস কিয়ারোস্তামি )

পাকিস্তানের হাইকুচর্চায় এসে লেগেছে উর্দু গজলের প্রভাব। মহম্মদ আমিন সমমাত্রিক পঙ্‌ক্তির হাইকুর ধারণা নিয়ে আসেন । উনি ছাড়া মহসিন ভোপালি, ওজাহাট নাসিম, ওমর তারিন-এর কথা বলতেই হয়।৪৬ 

বৃষ্টির বাদ্য

আমার মনে পড়ে 

ঘুঙুরের আওয়াজ 

 (মহসিন ভোপালি ) 

৫-৭-৫ লেখা জাপানি ছোট কবিতার অন্য ফর্ম কাতাউতা, যদিও বেশিরভাগ ক্ষত্রেই লেখা হত ৫-৭-৭ মাত্রা বিন্যাসে( কখনোসখনো ৫-৭-৫-এও) এবং একে বলা হত ‘অর্ধেক কবিতা’ । দুটি কাতাউতা মিলে তৈরি করে আরেকটি ফর্ম সেদোকা ।

কাতাউতা মূলত প্রেমের কবিতা, সেদোকা অনেকসময় কথোকপন বা প্রশ্নউত্তরধরমী হত, দ্বিতীয় কাতাউতায় প্রথমটির উত্তর। অষ্টম শতাব্দীর জাপানি কাব্যসঞ্চয়ন ‘মানিওশ্যু’তে কাতাউতা ও সেদোকা-র দেখা মেলে । পরবর্তীতে এর চর্চা প্রায় বিলোপ পায়, সম্প্রতি নানা ভাষায় নতুন করে এর চর্চা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

তিন পঙ্‌ক্তির ১৭ মাত্রার কবিতা হলেই কি তা হাইকু ? অথবা সেনরু ? 

না, হাইকুর কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম আছে আমরা জানি, কিন্তু তার বাইরে, সতেরো সিলেবল কিন্তু হাইকু না হলে তা যাপ্পাই। লি গুর্গা-র কথায়, “ সতেরো সিলেবলের সমস্ত কবিতা যারা হাইকুর প্রকৃত নিয়মনিষ্ঠ ও কারুকৃতির চরিত্রের সাথে মানায় না” তারাই হল যাপ্পাই। যাপ্পাইয়ের ঐতিহ্যও সমৃদ্ধ, এটি একটি স্বতন্ত্র আঙ্গিক, হাইকু লেখার ব্যর্থ প্রয়াস থেকে যাপ্পাই নয় ।

৫-৭-৫ আর ৭-৭ মাত্রাতে লেখা হয় যাপ্পাই

 

অলসভাবে

শুনি সকালবৃষ্টি

সেই মাঝির

 [ মিসাতোকেন (?)] 

চোখ নেই কান নেই মুখ নেই  

বৌ আর সৎমা তো আছে বেশ 

( ইয়াসিতা য়ুমিকো) 

জাপানের পাশের দেশ কোরিয়ায় তিনলাইনের পরম্পরাগত কবিতা শিজো, প্রতিটি লাইন ১৪ থেকে ১৬ মাত্রার, মোট ৪৪-৪৬ মাত্রার, বিষয় সৃষ্টিরহস্য, আধ্যাত্মিক বা ব্যক্তিগত। শিজো যেহেতু প্রাথমিকভাবে গান তাই গীতিময়তা এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। প্রতিটি লাইনে মাত্রার চারটি করে সমষ্টি থাকে, যেমন, ১৫ = ৩+৪+৪+৪। প্রথম লাইনে কবিতার মূলভাবটি উত্থাপন করা হয় আর সাধারণত একটি পরিচয় করানো হয় একটি ঘটনা-পরিস্থিতির সঙ্গে। দ্বিতীয় লাইনে থাকে মূলভাবটির বিস্তৃতি। তৃতীয় লাইনের দুটি অংশ, প্রথম অংশে প্রতিভাব বা মূলভাবটির পালটা আর পরের অংশে সিদ্ধান্ত। 

য়ুন সেয়ন্দো (১৫৮৭-১৬৭১)-র লেখা একটি শিজো

 আমার পাঁচ বন্ধুর গান

জিগ্যেস করো যদি কজন বন্ধু আমার ? জল আর পাথর, বাঁশ আর পাইন 

পুবের পাহাড় থেকে উঠে আসা চাঁদ তো আমার এক হাসিখুশি সখা 

এই পাঁচ সঙ্গীকে বাদ দিয়ে, কী আর আনন্দ আমি চাইতে পারি ? 

হাইকু বিশ্বময় এবং বিশ্বও হাইকুময়, কিন্তু বীতশোক ভট্টাচার্যের সেই কথা, জাপানি ছাড়া অন্য ভাষায়, জেন দর্শন ছাড়া অন্য চেতনা-স্রোতে হাইকু লেখা যায় না । হাইকুর মাধুর্যে মুগ্ধ হয়েছেন সারা পৃথিবীর কবিরা এবং আজকের দিনে সমসাময়িক জীবনযাপনে নিজের ভাষায় হাইকুচর্চার সীমাবদ্ধতা বুঝতে প্বেরেছেন, আমরা পেয়েছি কবিতার একের পর এক হাইকু-প্রভাবিত নতুন ফর্ম, কেউ কেউ সেগুলি বলেছেন ‘আধুনিক হাইকু’, আবার কেউ বলেছেন ‘ছদ্ম হাইকু’।

ইংরেজিতে হাইকু লিখতে সমস্যা হচ্ছিল অনেকেরই, সিলেবল বা ধ্বনিমাত্রার কাছাকাছি মোরা দিয়ে হাইকু লেখা সম্ভব হচ্ছিল না । ক্রমশ ইংরেজি হাইকু আলাদাভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে। তিন লাইনের, সিলেবল ১৭ বা তার কম, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ১০ থেকে ১৪ সিলেবলের, যতিচিহ্নের স্বল্প ব্যবহার, প্রয়োজনে কোলন বা ড্যাশ বা ইলিপ্স ব্যবহার, বাক্যগঠনে কাটাকাটা ‘টেলিগ্রাম স্টাইল’, অন্ত্যমিলহীন, দুই বিষম অংশের মধ্যে জাস্টাপজিশন – এই সব বিশিষ্টতা নিয়ে ইংরেজি হাইকুর আলাদা অস্তিত্ব ।

“ অ্যামেরিকান হাইকু হুবহু জাপানি হাইকুর মতো নয়। জাপানি হাইকুতে সতেরো সিলেবলের কঠিন নিয়মানুবর্তিতা কিন্তু যেহেতু ভাষার গঠন ভিন্ন আমার মনে হয় না অ্যামেরিকান হাইকু (সমগ্রের মধ্যে শূন্যতায় ঠেসে ভরানোর অভিপ্রায়ে তিন পঙ্‌ক্তির হ্রস্ব কবিতা ) সিলেবল নিয়ে চিন্তা করবে ... শেষ পর্যন্ত হাইকুকে হতে হবে সরল আর সমস্ত কাব্যিক চালাকি থেকে মুক্ত আর একটা ছোট্ট ছবি তৈরি করতে হবে, তবুও হয়ে উঠবে ভিভাল্ডি পাস্টোরেলার মতো খোলামেলা আর লাবণ্যময় ।” জাক কেরুয়াক বলেছেন অ্যামেরিকান হাইকু নিয়ে। 

( ভিভাল্ডি = ইতালিয়ান সঙ্গীতকার আন্তোনিও ভিভাল্ডি, প্যাস্টোরেলা = পল্লিবিষয়ক সঙ্গীত । ভিভাল্ডি প্যাস্টোরেলা হচ্ছে আন্তোনিও ভিভাল্ডির পল্লিবিষয়ক সঙ্গীত ) 

মাত্রার নিয়ন্ত্রণমুক্ত তিনলাইনের কাব্য এবং তা শুধুমাত্র প্রকৃতি বিষয়ক না,একটি ধারা হিসেবে মান্যতা পেল । অন্য দেশেও এই রীতি গৃহীত হল ।

অ্যামেরিকাতেই গত শতকের সাতের দশকে কবিরা তিন লাইনের বিন্যাস ছেড়ে জাপানে উল্লম্ব এক লাইনে লেখার প্রথা মাথায় রেখে এক লাইনে হাইকু লেখা শুরু করলেন। অবশ্য ইংরেজি প্রথা মতো এই লাইনটি অনুভূমিক। তৈরি হল এক লাইনের হাইকু, কেউ কেউ বললেন মোনোকু ( Monoku)। সাধারনত সিলেবল সতেরোর থেকে কম, যতিচিহ্নহীন, একটা বিরতি বা ছেদ থাকে যা ভাবনা বা বাকস্পন্দে ধরা থাকে ( কিরেজির সমতুল) ।

মার্লিন মাউন্টেন ( তিনিই প্রথম এক লাইনের হাইকু প্রকাশ করেন ‘পুরোনো টিনের ছাদ’ বইটিতে) এই ধারার প্রথমদিকের অন্যতম কবি, হিরোয়াকি সাতো জাপানি হাইকু ইংরেজি অনুবাদ করেছেন এক লাইনে আর মাৎসুও অ্যালার্ড এর পক্ষে প্রবন্ধ লিখেছেন অনেক। এই ফর্মটির প্রসারে এই তিনজনের ভূমিকা অনস্বীকার্য । তা ছাড়াও জিম ক্যাসিয়ান, জন উইলস, মার্টিন লুকাস, জন বার্লো, ক্রিস গর্ডন মোনোকুর ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য। 

আশা করি আছি ঠিক যেখানে নদীর বরফ শেষ 

 (জিম ক্যাসিয়ান)

প্রায় নতুন চাঁদ অদৃশ্য দেওয়লের নির্মিতির ভেতর দিয়ে আমরা যাই 

  ( ক্রিস গর্ডন )

দরজা খুলি এক আশ্চর্য মথকে যেতে দেয় অন্ধকার 

( মাৎসুও অ্যালার্ড )

এক পঙ্‌ক্তির কবিতা আর এক পঙ্‌ক্তির হাইকুর কিছু প্রভেদ আছে । বলা যায় সব এক পঙ্‌ক্তির হাইকুই এক পঙ্‌ক্তির কবিতা, কিন্তু সব এক পঙ্‌ক্তির কবিতাই এক পঙ্‌ক্তির কবিতা নয় । বাংলায় মোনোকুর চর্চা তেমন চোখে পড়ে না । এক পঙ্‌ক্তির কবিতার ভেতরেই কিছু বাংলা মোনোকু লুকিয়ে আছে । এককু নামে হয়তো আলাদাভাবে বাংলা মোনোকু চর্চা শুরু হতে পারে। 

অ্যালেন গিন্সবার্গ হাইকু লিখছেন ১৯৫৪ থেকে, তিন লাইনের হাইকু লিখেছেন তিনি আবার এই সীমাবদ্ধতা ছেড়ে বেরিয়ে আসেন, একটি লাইনে ১৭ সিলেবলের বাক্যে বেশ কিছু কবিতা লেখেন, যেগুলি পরিচিতি পায় ‘অ্যামেরিকান সেনটেন্স’ নামে। ১৯৮৭-৯২-এর মধ্যে লেখা এই ধরণের লেখাগুলি সংকলিত হয় তাঁর ‘বিশ্বজনীন শুভেচ্ছা’ ( Cosmopolitan Greetings, ১৯৯৪) কাব্যগ্রন্থে আর ১৯৯৫-৯৭-এর লেখাগুলি ‘মৃত্যু ও শিখা: শেষের কবিতা’ (Death and Flame: Last Poems,১৯৯৯) বইতে। হাইকুর বিস্ময়মুহূর্ত, জাক্সটাপজিশন কাজ করেছে এই বাক্যগুলিতে। 

কাস্তে চাঁদ, আঙ্কারার পথে বাসে মেয়েরা কিচিরমিচির করছে গোধূলিবেলায় । 

( অ্যালেন গিন্সবার্গ )

পরবর্তীতে এই ফর্মে লিখেছেন অনেকেই। 

ইঁটের খাটো দেওয়ালে বসে ছটি বাচ্চা মেয়ে ডিম স্যালাডের স্যান্ডউইচ খাচ্ছে । 

  ( কলিন ডাউসন )

বড়ো রাস্তার ফ্যান্টাসি

রাতের বেলায় একটা হেডলাইট পুড়ে যাওয়া গাড়িগুলো মোটরবাইকের ভান করে ।

( ওরি ফিনবার্গ)

১১বছর ধরে প্রতিদিন একটি করে লেখা একেকটি বাক্য নিয়ে প্রকাশিত পল নেলসন-এর ‘অ্যামেরিকান সেনটেন্স’ ( American Sentences, Apprentice House,২০১৫)

এক শব্দের কিছু কবিতাকে কেউ কেউ এক শব্দের হাইকু বললেও হাইকুর কোনো চরিত্রই তাতে ধরা পড়ে না। 

জন স্টিভেনসন-এর হাইকুর বই ‘জীবিত আবার’ ( Live Again, ২০০৯)-এর বইটির মাঝে একটি পৃষ্ঠায় আছে শুধু

Core 

শব্দটি। 

এর পর আসে দুলাইনের হাইকুর কথা। ১৯৩২-এ আসাতারো মিয়ামোরা ধ্রুপদী হাইকু অনুবাদে দু লাইনের বিন্যাসই ব্যবহার করেছিলেন। হ্যারল্ড স্টুয়ার্টা, ল্যাফকার্ডিও হেয়ার্ন এই শৈলীই বেছে নেন। হাইকু যেহেতু দুটি ছবির জাস্টাপজিশন তাই দুটি লাইনে দুটি ছবি রেখে হাইকু লেখার পক্ষপাতী কেউ কেউ । 

কাঠের স্তুপে

কুঠারের ভাঙা হাতল  

( মাইকেল ফ্যাচার্টি)

হাইকু লেখা হচ্ছে চারলাইনেও, একে কেউ কেউ বলেন হাইকুয়া ( Haiqua)। টিটো (স্টিফেন গিল-এর ছদ্মনাম) বেশ কিছু চার লাইনের হাইকু লিখেছেন ।

পাথরে বাঁধানো সৈকতের আরও নীচে 

আরেকজন সূর্যাস্ত-দর্শকের 

মুখ

তামার আভা হারালো 

( টিটো )

পাঁচ বা তার বেশি লাইনের হাইকুতে শব্দগুলি সাজানো হয় উল্লম্বভাবে।

পাতার মন্ডের

নীচে

পাথর

ঠাণ্ডা

পাথর 

 ( মার্লিন উইলস, মার্লিন মাউন্টেন নামেও পরিচিত )

ভিস্যুয়াল পোয়েট্রির মাধ্যমে হাইকুকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হয়েছে ।


{{লেখার শেষের প্রথম ছবি}}

( লিরয় গরম্যান)

চেষ্টা হয়েছে কংক্রিটের রূপ দেওয়ার

{{লেখার শেষের দ্বিতীয় ছবি}}

( মার্লিন মাউন্টেন )  

লেখা হয়েছে চক্রাকারে হাইকু বা Cirku, ৫-৭-৫-এর তিনটি লাইন গোল করে লেখা, কোনো নির্দিষ্ট শুরু-শেষ নেই, ঘুরে ঘুরে পড়া যেতে পারে ।

{{তৃতীয় ছবি}}

( পিঙ্ক উইচ) 

অঙ্ক কবিতার ঘরানায় গাণিতিক চিহ্ন দিয়ে অঙ্ককু ( Mathemaku) লিখেছেন বব গ্রুম্যান।

((চতুর্থ ছবি))


জাপানেও হাইকুও আর সেই প্রাচীন ধারণায় আটকে নেই, বদলে গেছে জীবন, বদলে গেছে হাইকুও, যন্ত্রসভ্যতার ছোঁয়া লেগেছে তার শরীরে। ‘জেন্ডাই হাইকু’ এই সময়ের জাপানি হাইকু । জেন্ডাই মানে আধুনিক, সমসাময়িক । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আভিঘাত থেকে মাথা তুলে দাঁড়ানো জাপানের হাইকু এই জেন্ডাই হাইকু। ১৯২০-র পরপর ‘নব উদীয়মান হাইকু আন্দোলন’ ( শিনকো হাইকু উন্দো) নতুন বিষয়ের ওপর হাইকু লেখা আর সমসাময়িক সমাজ জীবনের ভাবনা ও শৈলীর ব্যবহারের প্রচেষ্টা শুরু করে। এই কবিরা কিগো বাদ দেন তাঁদের রচনা থেকে। উদা কিয়োকা, হোশিনাগা ফুমিনো, সুবৌচি নেনতেন, হাসেগাওয়া কাই, কানেকা তোতা, হিরাহাতা সেইতো উল্লেখযোগ্য জেন্ডাই হাইকু কবি । তাঁদের কিছু কবিতা 

এ পৃথিবীতে

গনগনে গ্রীষ্ম সূর্যে

তিতলি ফুড়ুৎ 

 ( হাসেগাওয়া কাই)

বসনকালে –

বেপরোয়া শুয়ে পড়ে, যেন

জলহস্তী 

 ( সুবৌচি নেনতেন )

চুয়িংগাম 

শত্রুতা চিরোচ্ছে –

গ্রীষ্ম বিদ্রোহী 

 (হোশিনাগা ফুমিনো) 

হাইকু নিয়ে নিরীক্ষা সারা পৃথিবী জুড়ে ।

এই সময়ের উল্লেখযোগ্য অ্যাফ্রো-অ্যামেরিকান কবি, ব্ল্যাক আর্ট আন্দোলনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব সোনিয়া স্যাঞ্চেজ (জন্মঃ ১৯৩৪ ) হাইকু লিখেছেন বেশ কিছু। 

আমার মুখ ভয়ের

স্মারক তোমার সহজ

আসা যাওয়ার 

(সোনিয়া সাঞ্চেজ )

তাঁর তৈরি করা ফর্ম সানকু, ৪-৩-৪-৩ বা ৩-৩-৩-৩ মাত্রার চার থেকে এগারো লাইনের কবিতা। ছাত্রদের হাইকু বিষয়ে পড়াতে গিয়ে সানকুর সৃষ্টি, “সানকু আমার ফর্ম ... নাম না দিয়ে তুমি কিছুই ঠিকঠাক করতে পারো না। আমি ছাত্রদের বলি যে এই ক্রিয়েট্রিভ রাইটিং কাজটায় তোমাকে কিছু তো সৃজন করতে হবে । ... যখন নিজের ফর্ম সৃষ্টি করতে পারে তখন সবাই বলবে যে তুমি সত্যিই ধরতে পেরেছ সেই ব্যাপারটা যাকে বলা হয় কবিতা ।” 

তাঁর একটি সানকু 

পুজো কোরো

যতক্ষণ না

হয়ে যাই পাথর

ভালোবেসো

যতক্ষণ না

হয়ে যাই হাড় 

পাঁচ লাইনের কবিতাকে বলা হয় সিনকেইন, অ্যামারিকার কবি অ্যাডিলেড ক্র্যাপসে( ১৮৭৮-১৯১৪)-র বিশেষভাবে পাঁচলাইনের কবিতা (২-৪-৬-৮-২ সিলেবল বিন্যাসে) পরিচিত অ্যামারিকান সিনকেইন নামে। তা থেকে ডেনিস গ্যারিসন পাঁচ লাইনে হাইকু-র সাজিয়ে তৈরি করেন সিঙ্ককু-র ফর্ম। যথাক্রমে ২-৩-৪-৬-২ মাত্রার পাঁচটি লাইন, মুক্ত প্রকরণ,একটিতে শিরোনাম থাকে না, একটি ‘মোচড়’ থাকে ( চতুর্থ ও পঞ্চম লাইনের মাঝে) কিরেজির মতো, উল্টো মাত্রায় বিপ্রতীপ  সিঙ্ককু, পরপর দুটি সোজা ও বিপ্রতীপ মিলে আয়ানা সিঙ্ককু ও অনেকগুলি মিলে হয় সিঙ্ককুক্রম, এদের শিরোনাম থাকতেও পারে। 

  কান্না 

 স্নানকে 

 ভেতর থেকে

 ধুইয়ে মুছে দেয় 

 ক্ষত 

লুইস সিপফি হাইকুয়েট (Haikuette) ফর্মটি বানান, তিন লাইনের কবিতা, ১৭ বা তার কম সিলেবলের, প্রতিটি লাইন সম্পুর্ণ ও পৃথক, ক্রিয়াপদহীন, অন্ত্যমিল নেই, শিরোনামযুক্ত ।

তুমি

নতুন তিল-দাগের শালুক 

সুগন্ধী, গোলাপি, স্বাদু

রোদে তোমার মুখ

( জুডি ভ্যান গোদার )

ন্যূনতম কবিতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আরও কম শব্দ, আরও কম মাত্রার ধ্বনি দিয়ে তিন লাইনের ‘ছোট হাইকু’র ফর্ম Miku,মিকু তৈরি করেন কেভিন টেলার। মূলত প্রকৃতির বিষয়ে লেখা,এতে নির্দেশক পদ বাদ দেওয়া হয়, প্রতিটি লাইনে খুবই অল্প শব্দ, শিরোনাম থাকে না, থাকে না অন্ত্যমিল,যতিচিহ্ন ও ইংরেজিতে বড় হাতের অক্ষর। বলা যেতে পারে সংক্ষেপিত হাইকু বা ন্যূনতম শৈলীর হাইকু ( MInimalist haiKU)। 

ফিঙে

ডাল থেকে 

হাওয়ায় 

গাই সির্কেস-এর শৈলী গাইকু ( Guyku) ক-ক-ক মিলযুক্ত তিন লাইনের কবিতা যা শুরু হয় “ Hi, my name is…” দিয়ে, বাংলায় উপযুক্ত সম্বোধন শব্দ দিয়ে শুরু হব। 

 হাই, আমার নাম অনিন্দ্য রায় 

 তিন লাইনে যে কবিতা লেখা যায় 

 বুঝতে গিয়ে বসেছি হাইকুর ছায়ায়

গাইকু শব্দটি অবশ্য একটি অন্যভাবে ব্যবহৃত ২০১০-এ প্রকাশিত বব রেকজকা-র ‘গাইকু: ছেলেদের জন্য হাইকুর এক বছর’( Guyku: A Year of Haiku for Boys, Houghton Mifflin  Harcourt Trade & Reference Publishers, 2010) বইটিতে 

 বাতাসের সাথে খেলি

 ঘুড়ি নিয়ে দড়ি টানাটানি 

 বাতাসই জেতে 

এই রকম হাইকু আছে যা ছেলেদের (Guys)জন্য লেখা, বিষয় প্রকৃতি আর বাইরের খেলাধুলো। 

অ্যালিস স্টিফেনসন ওরফে SEA angle-এর উদ্ভাবিত ফর্ম পিক্সিকু ( PixIku), ৩ লাইনের কবিতা, মাত্রাগত নিয়ন্ত্রণ নেই, জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে ব্যক্তিগত উচ্চারণ, বলা যায় ‘হাইকু ও সেনরুর বেপরোয়া সন্তান’।

জনগন 

তারা সব নাটকের রাজা আর নাটকের রানি

নাটকের বাবা আর নাটকের মা

আর আমাদের মধ্যে যারা মাঝে আটকে পড়েছি 

(SEA angle) 

জাপানি ধ্বনিমাত্রিক বিন্যাস ইংরেজির সঙ্গে ঠিক মানানসই নয়, এই ভাবনা থেকে গত শতকের ষাটের দশকে রবার্ট কেলি তৈরি করলেন নতুন আঙ্গিক চাঁদ-কবিতা লুন (Lune), ৫-৩-৫ ইংরেজি সিলেবলের তিনটি লাইন, ডানদিকের প্রান্তটি দেখতে অনেকটা চাঁদের কাস্তের (crescent)-র মতো, তাই এই নাম । 

গাছ হাঁটে না  

  মাঠে সে  

ছড়িয়ে পড়ে ।  

 ( রবার্ট লি ব্রেয়ের) 

বিষয়গত বা অন্য কোনো বিধিনিষেধ নেই। কেউ কেউ লুনকেই বললেন ‘অ্যামেরিকান হাইকু’।

জয় গোস্বামীর এই কবিতাটি লুনের কাছাকাছি 

  চিনতাম, বহু আগে 

  এখন আমার

  চারিদিকে চোরকাঁটা ।

  ( কয়েকটি নিমেষ ) 

কেলির এই ফর্ম বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে । জ্যাক কল্লম লুন বোঝাতে গিয়ে ব্যাপারটা ভুল করেই একটু সহজ করে ফেললেন । সিলেবলের বদলে তিনি গুরুত্ব দিলেন শব্দকে । তিনটি লাইনে ৩, ৫ ও ৩টি শব্দ দিয়ে তৈরি হল লুনের আরেকটি আঙ্গিক । 

    গাছেরা গুনতে শেখেনি 

   এক একটি করে পাতা ঝরায়  

      যেন হিসেব রাখছে ।

এখানেও ডানদিকে বাঁকা চাঁদের ধারই মনে হয়  যদিও তা উল্টোদিকে ।

হিব্রুতে তিন লাইনের কবিতা কিমো । যদিও ইস্রায়েলে চিরায়ত রীতির হাইকুর চর্চাও আছে ।২০১০- প্রকাশিত জেন এলিজাবেথ ওয়ার্ডের ‘Jean  Elizabeth Ward Presents Kimo Poems’ (Lulu.com) বইটি থেকে আমরা জানতে পারি, হাইকু-উত্তর কবিতা-আঙ্গিক কিমো, এরও তিনটি পঙ্‌ক্তি, যথাক্রমে ১০,৭,৬ মাত্রার। এর জন্ম ইস্রায়েলে । হাইকুর ৫-৭-৫-এর থেকে হিব্রু ভাষায় আরেকটু বেশির প্রয়োজন মেটাতে কিমোর উদ্ভাবন । সাধারণত একটিমাত্র স্থির দৃশ্যের বর্ণনা থাকে এতে, তাই এতে গতিময়তা থাকে না। অন্ত্যমিল আবশ্যিক নয়। 

চৈত্রশেষে সুতো ধরে পদ্মে 

মেয়েরা বুনে নেয় 

রহস্যের তাঁতে 

( জেন এলিজাবেথ ওয়ার্ড)

আই(না)কু, Hai(na)ku , ৩ লাইনের কবিতা, প্রথম লাইনে একটি, দ্বিতীয়তে দুটি আর তৃতীয়-য় তিনটি শব্দ; ব্যাস ! এ ছাড়া আর কোনও নিয়ম নেই, বিধিনিষেধ নেই।

এই ফর্মটি ২০০৩-এ তৈরি করেন ফিলিপিন্স-জাত আমেরিকান কবি এলিন তাবিওস ( Eileen Tabios), তিনি এটির নাম দিয়েছিলেন ‘পিনয় হাইকু’ ( ফিন্সিপিন্সের জনগন ও তাদের সংস্কৃতিকে বলা হয় পিনয় ) পরবর্তীতে ভিন্‌সে গোতেরা এর নাম দেন হায়(না)কু, ফিলিপিন্সে প্রচলিত অস্ট্রেলেশিয়ান ভাষা টেগালগ-এ যার মোটামুটি মানে হয় ‘ওহ্‌!’। 

ছেলেরা 

মেয়েদের পেছনে 

খেলার মাঠে ছুটছে 

   ( রবার্ট লি ব্রেয়ের) 

  রোদ 

  পাতাকে ঝাঁকাচ্ছে

  কঁকিয়ে উঠল ছায়া 

এটি এখন একটি জনপ্রিয় ফর্ম, নানা দেশের কবিতা মেতেছেন এই ধারায়।

২০০৫-এ জেন ভেনগুয়া ও মার্ক ইয়ং-এর যুগ্ম সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘প্রথম হায়(না)কু অ্যান্থলজি’, দ্বিতীয় খণ্ড ২০০৮-এ। 

Ku(na)hai বা কু(না)হাই উল্টো আই(না)কু-র শব্দবিন্যাস হল উল্টো, প্রথম লাইন থেকে যথাক্রমে ৩, ২, ১টি শব্দ।

  কখনো প্রেমে পড়েননি 

  রাত্রি জেগেছেন 

  কবি 

পরপর অনেকগুলি হায়(না)কু স্তবক গেঁথে তৈরি হতে পারে হায়(না)কু শৃঙ্খল । 

২০০৮-এ এলিন তাবিওস হায়বুনের মতো করে আইবু(না)কু {Haibu(na)ku] প্রস্তাব করেন । একটি যে কোনো দৈর্ঘ্যের গদ্যের পরে এক বা একাধিক আই(না)কু। 

গিন্সবার্গের অ্যামেরিকান সেনটেন্স মাথায় রেখে ৬ শব্দে লেখা একটি বাক্য বা আই(না)কু বাক্যের প্রয়াস করেন ভেনগুয়া, ফিলিপিনো উৎসের ব্যাপার ভেবে একে বলেন আনআমেরিকান সেনটেন্স। 

বনমানুষেরা আর নেই, কাকেরা নেমে আসে ।

  (জেন ভেনগুয়া)

বাংলা এক পঙ্‌ক্তির কবিতার ঐতিহ্যে ৬ শব্দের এই প্রকরণ বেশ মানিয়ে যেতে পারে ।

সমুদ্র নিজের স্নানে সমস্ত মুছে ফেলে 

হাইকু সনেট হল ১৪ লাইনের কবিতা, প্রথম ১২ লাইনে চারটি তিনলাইনের স্তবক, হাইকুর মাত্রাবিন্যাস মেনে, শেষ দুলাইনে ৫ অথবা ৭ মাত্রার একটি দ্বিপদী। 

ছাতারেদল

কাচে নিজের মুখ

লড়াই জোর 

মেঘ মুছছে 

আকাশ থেকে রোদ

কাচের ছায়া 

উড়ে পালায়

কিচিরমিচকিচ 

ঘুম কাটে না

পাখির দিন

আমার ঘুমের চে’

বড়ো অনেক

পালক পড়ে আছে 

উড়ছে গতরাত 

হায়(না)কু-র নিয়ম মেনে হাইকু সনেট লিখেছেন ভিন্‌সে গোতেরা, চারটি আই(না)কু বা বিপরীত আই(না)কু ও তারপরে তিন শব্দের ১৩ এবং ১৪তম লাইন 

৯/১১ + ১২

ডানাহীন

চড়ুইয়েরা পড়ছে

ছাইভরা আকাশ থেকে 

প্রেতরা

ছাইয়ের কুয়াশায় 

আবছা দেখা যাচ্ছে 

বারো বছর পর

এখনো আটকে 

আফগানিস্থান 

বিন লাদেন মৃত

ঘড়ির বালি

ঝরছে 

আমাদের উৎরাই: ছাই

নরক পতন সাম্রাজ্য

( ভিন্‌সে গোতেরা)

বর্ণমালা হাইকু ( Alphabet Haiku ) ফর্মটি তৈরি করেন বিয়াত্রিচে ইভান্স ওরফে রনিকা, ৫-৭-৫ মাত্রার তিনটি লাইন, প্রতিটি শব্দ একটি কোনো বর্ণ দিয়ে শুরু হবে 

কোকিল কাঁদে

 কুসুমে কালো কীট 

কবিতা কার

π (পাই) গ্রিক বর্ণমালার একটি বর্ণ। গণিতে একটি ধ্রুবক, বৃত্ত যত ছোট অথবা বড়ই হোক না কেন সেটির পরিধি এবং ব্যাসের অনুপাত সবক্ষেত্রেই অভিন্ন, সবসময়ই  স্থির; আর এই তাকেই আমরা চিনি π নামে, উচ্চারণ করি ‘পাই’। এটি কোনো র‍্যাশনাল নাম্বার নায়, একে কোনো ভগ্নাংশে প্রকাশ করা যায় না। তবু বাইশের সাত, ২২/৭ এই ভগ্নাংশটি পাইয়ের কাছাকাছি।

আর দশমিকে ? সেভাবে তো পাইয়ের প্রকৃত মান নিষ্পত্তিই হতে চায় না। যেন একটা অশেষ সংখ্যা। একের পর এক ডিজিট, একশো ... হাজার ... আরও বাড়তে থাকে দশমিকের ডানদিকের সংখ্যা, ফুরোয় না, এমনই একটি রাশি আমাদের π, তার মান, বলা যায় 

৩ . ১৪১৫৯২৬৫৩৫৮৯৭৯৩২৩৮৪৬২৬৪৩৩৮৩২৭৯... 

পাইয়ের মতো করে লেখা ইংরেজিকে বলে পাইলিশ, যাতে প্রথম শব্দটি তিন অক্ষরের, দ্বিতীয়টি ১, তৃতীয়টি ৪, তারপর ১, ৫, ৯, ২ অক্ষরের, এইভাবে ... 

আর পাইয়ের মান মেনে লেখা হাইকু, Pi-ku, পাইকু, তিন লাইনের শব্দসংখ্যা/ মাত্রাসংখ্যা যথাক্রমে ৩-১-৪ 

we will rest 

here 

on shore of pond

 (Mark Wendel ) 

বাংলায় মাত্রা ধরে  

চোখের 

না

মুজে গেল 

শব্দ ধরে 

দরজা নিজে খোলে 

না

আমাদের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করে 

পাইকু লেখার আরেকটি রীতি, একটু বড় পঙ্‌ক্তিতে, ৩-১৪-১৫ মাত্রায় ।

It’s a moon, 

A wheel revolving on golden earth, and lotus blossoms.

 Mountains embrace windmills, and it all reflects this number, pi.

   (Mike Keith ) 

গাছেরা 

বনের ভেতরে আরো ঘন হয়ে আছে

কুঠারের দাগে ঝরছে ভালোবাসাবাসি 

 

Pilish haiku আবার একটু আলাদা, এখানে পরপর শব্দগুলির বর্ণসংখ্যা পাইয়ের মানের সংখ্যার ক্রম অনুসরণ করে, কিন্তু মাত্রাবিন্যাস হাইকুর চিরাচরিত ৫-৭-৫ মেনেই হয়। 

was a poem I wrote 

gibberish in pilish verse 

was haiku diffused 

(Mark Wendel ) 

হাইকু সতেরো মাত্রা মেনে দু’ লাইনের ফর্ম স্ফটিক বা Crystalline, মাত্রা বিন্যাস ৮-৯ বা ৯-৮, কমবেশিও হতে পারে কিন্তু মোট ১৭ । ইংরেজি গ্রামারের নিয়ম মেনে, যতিচিহ্ন, বড়ো হাতের অক্ষর, সিনট্যাক্সের যথাযথ ব্যবহারে লেখা দু’টি লাইন, আবার একাধিক লাইন জোড়ে দীর্ঘ হতেও পারে । থাকবে কিগো এবং কিরেজি । এবং যে ছবি ফুটিয়ে তোলা হবে তা হবে স্বচ্ছ । 

গ্রীষ্মের ধুলো ঢেকে দিয়েছে তাকটাকে 

গত বসন্তে যেখানে আংটি খুলে রেখেছ । 

( জুডি ভ্যান গোদার )

Scifai-ku, বাংলায়

বলতে পারি কবি-কু বা ক(ল্প)বি(জ্ঞান)-(হাই)কু কল্পবিজ্ঞানের কবিতার একটি ফর্ম, ১৯৯৫-তে টম ব্রিঙ্ক এর ইস্তেহার ঘোষণা করেন । হাইকুর তিন লাইনের ১৭ মাত্রার বিন্যাসে লেখা কল্পবিজ্ঞানের কবিতা । ১৯৬২-তে প্রকাশিত কারেন অ্যান্ডারসনের ‘ছয় হাইকু’ই ( The magazine of fantasy and Science Fiction, July,১০৬২) সম্ভবত এর আদি নিদর্শন। তার চতুর্থটি 

 ওই কুড়মুড়ে শশাগুলো

এখনও  লাগানো হয়নি সিরটিসে

একখানা পাবো যে কীভাবে

(সিরটিস= উত্তর আফ্রিকা(লিবিয়া)-র বালুকাময় উপসাগর, মঙ্গলগ্রহে উত্তরের নীচু জায়গা আর দক্ষিণের উঁচু জায়গার মাঝখানের এলাকা)। বেশ জনপ্রিয় এই ধারা, বিজ্ঞানের বিষয় আর হাইকুর কাব্যময়তা মিলেমিশে আকর্ষনীয় এক উপস্থাপনা 

“ একবার আমাকে যখন

 এলিয়ানরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল...”

 খুড়ো বাচ্চাটাকে চাদরে মুড়ে দিল 

 ( টম ব্রিঙ্ক ) 

এর কিছু উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা 

 ত্রৈমাসিক অনলাইন ও মুদ্রিত পত্রিকা Scifaikuest 

জন জে. ডানফি-র লেখা স্কিফাইকু ও হায়বুনের সংকলন 'নক্ষত্র বিষয়ক সম্ভবনাগুলি' (Stellar Possibilities, ২০০৬) 

দেবোরাহ্‌ পি. কোলোজি-র স্কাইফি-পুস্তিকা 'লাল গ্রহের ধুলো' (Red Planet Dust, ২০০৬)

জোযান মরকম-এর স্কিফাই,তনকা, হাযবুনের বই 'অনামী এলাকা' (A Nameless Place by, ২০০৬) 

টেরি স্যান্টিটোরো ও এল.এ. স্টোরি হাউরি সম্পাদিত স্কিফাইকু অ্যান্থোলজি 'এলোমেলো গ্রহগুলি' Random Planets Santitoro and L.A.) জেস সি স্কট-এর স্কাইফু অ্যান্থোলজি ‘তাৎক্ষণিক (অ)প্রকৃতিস্থতা [Instantaneous (In)sanity, ২০১২] 

বাংলায় কতটা সম্ভবানা কবি-কুর ?

 আলোর থেকে 

 জোরে ছুটতে পারে 

 আঁধারকণা 

বা

 কৃষ্ণগহ্বর 

 পেরিয়ে সে পৌঁছল

 অনন্ত বিশ্বে 

এইভাবেই কামোদ্দীপক ভাবনা হাইকুকাঠামোয় এনে তৈরি হয়েছে Erotiku বাErotic Haiku, বাংলায় বলতে পারি কামকু বা কাম(উত্তেজক)(হাই)কু । 

২০০৪-এ লিজা মেরি ডার্লিংটন-এর ‘এরোটিকু: ইন্দ্রিয়গত মনের কামোদ্দীপক হাইকু' (Erotiku: erotic haiku for the sensual soul) প্রকাশিত হয় । বইটিতে আছে কোনো মাত্রাগত বিধিবদ্ধতা ছাড়াই তিন পঙক্তির বিন্যাসে লেখা কবিতা । বইটি থেকে 

তার উত্থিত ফলা 

তার উত্থিত ফলা 

এপাশ ওপাশ কাটছে কাঁচির মতো 

ওর নেতিয়ে পড়া ফুলের ভেতর 

রোগা শরীর তার 

তার উত্থিত ফলা 

 পালঙ্কে বেঁকে 

ধনুক হয়েছে সুখে 

হিরোয়াকি সাতো-র জাপানি ও ইংরেজি দ্বিভাষিক বই ‘কামোদ্দীপক হাইকু’ (Erotic Haiku, ২০০৫) থেকে 

সেই প্রথমবার 

আমার মধ্যমা পিছলে ঢুকল 

তোমার উষ্ণ ভেজা ফাটলে 

২০১৪-য় জেসমিন ম্যাগনাস-এর বই‘কামকবিতা: কামোদ্দীপক হাইকু কবিতা’ বইটি বেরিয়েছে । জর্জ সয়েদে ও টেরি অ্যান কার্টার সম্পাদিত ‘কামোদ্দীপক হাইকু: ত্বকের, ত্বকে’ (Erotic Haiku: of skin, on skin,২০১৭) 

গ্রীষ্মের রাত

মেয়েটি খুলে ফেলে

তার ক্রুশকাঠ 

 (জর্জ সয়েদে) 

বাংলায় কেমন হতে পারে? 

স্তনের বাতি 

জ্বেলেছ বন্ধ ঘরে 

অন্ধ হয়েছি 

বা 

বৃষ্টির শেষে

দুটি পাতার ফাঁকে 

রস গড়াচ্ছে 

আমরা বলতে পারি ‘কামকু’ । 

আর হাইকুর বিষয় ভয়ের কিছু, আতঙ্ক-জাগানো-কিছু যখন তাকে বলা হচ্ছে Horrku বা Horror Haiku আমরা বলতে পারি ভয়কু। 

ফিলিপ রবার্ট-এর বই ‘ভয়ের হাইকু সংগ্রহ: অভিশপ্ত আত্মার দেশ’ ( ২০১১) থেকে

রাতের ঈগলেরা 

রাতের ঈগলেরা উড়ছে

ঠিক ছাদের ওপরে

তোমাকে তীক্ষ্ণ নজরে রাখছে  

২০১৬-য় প্রকাশিত এ.এফ.স্টুয়ার্ট-এর ‘ভয়ের হাইকু ও অন্যান্য কবিতা’ বইটি আছে ২৮টি হাইকু আর ১৮টি দীর্ঘতর কবিতা। তা থেকে

দেখতে পাচ্ছি না, যন্ত্রণা 

একটা কিছু টিপে ধরেছে বৌ

আমার চোখ, চিৎকার করি 


বাংলায়

  তারপর সে

ভয়ে জড়িয়ে ধরে 

নিজের লাশ 


বা

কেউ থাকে না 

বাড়িটি নিজেই কাঁদে 

কেউ থাকে না ? 

ইমানুয়েল সাম্পসন আব্দালমাসিহ্‌-এর ‘আয়না হাইকু’র কথা আমরা আগেই জেনেছি, পরপর দুটি ৩ লাইনের হাইকু যাদের লাইন বিন্যাস উল্টো অর্থাৎ প্রথমটির প্রথম লাইন হুবহু দ্বিতীয়টির তৃতীয় লাইন, আবার প্রথমটির তৃতীয় লাইন দ্বিতীয়টির প্রথম। 

পলাশ দাউ

আকাশ ছুঁয়ে আছে  

কারুর জ্বর 

কারুর জ্বর 

আকাশ ছুঁয়ে আছে

পলাশ দাউ

একের পর এক হাইকু সাজিয়ে লেখা হচ্ছে ধারাবাহিক হাইকু ( Serial Haiku), হাইকুক্রম (Haiku Sequence ), কখনো একজনের লেখা বা কখনো যৌথকবিতা । 

হাইকু এভাবেই চিরায়ত ও নতুন, এভাবেই নিয়মনিষ্ট ও নিয়ম-ভাঙা, এভাবেই মুহূর্ত থেকে অনন্ত ।

বাংলাতেও হাইকু নিয়ে উৎসাহ ও নিরীক্ষা আমরা লক্ষ্য করি । বিশাখ, বাংফু, বাইকু, মুক্তক হাইকুর কথা আমরা জানি। 

হাইকু, এই খেলার ছলে কবিতা, সারা পৃথিবীর কবিতায় এক বিস্ময় ।

ভাষা পেরিয়ে

তিন পঙ্‌ক্তির দেশ 

অসীম পল 

[ যে হাইকু বা হাইকুর অনুবাদগুলির সঙ্গে রচয়িতা বা অনুবাদকের নাম নেই সেগুলি নিবন্ধকারের । 

অনুবাদে সব ক্ষেত্রে মাত্রার নিয়ম মানা সম্ভব হয়নি । অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, স্বরবৃত্ত, মুক্তক প্রয়োজনানুসারে ব্যবহার করা হয়েছে । ] 

সূত্র 

১ । Jim Kacian, How To Haiku , Red Moon Press, Winchestar, 2016  

২ । Itsuki Natsui, Treasures of Haiku, Haiku Guide, Tourism and International Exchange Division, Industrial Economy Division, Matsyama City, 2015 

৩ । মুজিব মেহদী, ত্রিভুজাসম্ভাষ, শুদ্ধস্বর, ঢাকা, ২০১৩  

৪ । Kala Ramesh, the heart of a haiku, essays on how to haiku, The British Haiku Society, 2006 

৫ । W. G. Aston, A History of Japanese Literature, Short Histories Of The Literature Of The World, vol.: 4,William Heinemann, London, 1899  

৬। Joan Giroux, The Haiku Form, Charles E. Tuttle Company, Rutland & Tokyo, 1974 

৭। Jim Kacian, How To Haiku , Red Moon Press, Winchestar, 2016 

৮ । Keneth Yasuda, The Japanese Haiku: Nature, History, and Possibilities in English with Selected Examples, Rutland & Tokyo,1957

৯ । Joan Giroux, The Haiku Form, Charles E. Tuttle Company, Rutland & Tokyo, 1974 

১০ । Kala Ramesh, the heart of a haiku, essays on how to haiku, The British Haiku Society, 2006

১১ ও ১২। Harold G. Handerson, Haiku in English, Charles E. Tuttle Company, Rutland & Tokyo, 1967  

১৩ । Joan Giroux, The Haiku Form, Charles E. Tuttle Company, Rutland & Tokyo, 1974 

১৪ । মুরারি সিংহ, চিহ্নহীন নদী ও মেঘ ০ জেন-কবিতা, পোস্টমডার্ন ও চর্যাপদ, কবিতা পাক্ষিক, কলকাতা, ২০০৯ 

১৫ । Joan Giroux, The Haiku Form, Charles E. Tuttle Company, Rutland & Tokyo, 1974 

১৬ । মুজিব মেহদী, ত্রিভুজাসম্ভাষ, শুদ্ধস্বর, ঢাকা, ২০১৩ 

১৭ । Jim Casican, How To Haiku , Red Moon Press, Winchestar, 2016  

১৮ । মুজিব মেহদী, ত্রিভুজাসম্ভাষ, শুদ্ধস্বর, ঢাকা, ২০১৩ 

১৯ । বীতশোক ভট্টাচার্য, জেন কবিতা , অর্চনা, কলকাতা, ১৯৯০ 

২০। Kala Ramesh, A History of Haiku in India, The Haiku Foudation, 2008 

২১। Abid Anowar, Bangla Haiku: The phonetic hurdles, The Daily Star, February 21, 2010  

২২ , ২৩ ও ২৪। মুজিব মেহেদী, ত্রিভুজাসম্ভাষ, শুদ্ধস্বর, ঢাকা, ২০১৩ 

২৫। মুজিব মেহদী, বাইকু বর্ণমালা,www.sachalayatan,com,৬/১১/২০১১ 

২৬ । দেবব্রত সরকার, বাংলা হাইকু, কবিতা ক্যাম্পাস, হাওড়া, 

২৭ । ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্দীপন : জাপানি হাইকু, বিশাখ ও মাত্রিক কাব্য,ফার্মা কেএলএম প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ২০০১ 

২৮ ।  মুজিব মেহদী, ত্রিভুজাসম্ভাষ, শুদ্ধস্বর, ঢাকা, ২০১৩ 

২৯ । শশাঙ্কশেখর পাল, হাইকু চালে বাংফু, মধ্যবর্তী, কলকাটা,২০১০

৩০ । রহিম আখতার কল্পনা, তিনশত বাংলা হাইকু , ম্যাগনাস ওপাস, ঢাকা, ২০১১ 

৩১ । Bertrand Agostioni, A History of Haiku in France, Modern Haiku, 2001

৩২ । Jim Kasian, A History of Haiku in United States, The Haiku Foundation, 2017 

৩৩ । David Cobb, A History of Haiku in the British Isles, The Haiku Foundation 

৩৪ । Terry Ann Carter & Jannick Belleau, A History of Haiku in Canada, The Haiku Foundation

৩৫ । George Swede & Anita Krumins, A History of Haiku in Mexico, The Haiku Foundation, 2017

৩৬ । Susana Benet, Elisa Rovera Gil, Joana Sturzinka, A History of Haiku in Spain, The Haiku Foundation, 2017

৩৭। Klaus-Dieter Wirth, History of German Language Haiku, The Haiku Foundation, 

৩৮ । Lars Vargo, History of Haiku in Sweden, The Haiku Foundation, 2016

৩৯ । Andreyev Alexey, Vayman Zinovy, A History of Russian Haiku, The Haiku Foundation, 2016 

৪০ । Antonella Filippi, A History of Haiku in Mexico, The Haiku Foundation, 2018

৪১ । Rosa Climent, A History of Brazilian Haiku, The Haiku Foundation

৪২ । Ernest P. Sanyiago, A History of Filipino Haiku, The Haiku Foundation,

৪৩ । Adjei Agyei-Baah, Haiku of Africa, The Haiku Foundation, 2017 

৪৪ । Adjei Agyei-Baah, Afriku, Red Moon Press, 2016 

৪৫ । Eva Lucie Witte, Massih Talebian,A History of Persian Haiku, The Haiku Foundation

৪৬ । Sohail Ahmed Siddiqui, A History of Haiku in Pakistan(Urdu), The Haiku Foundation, 

image4